তীব্র নাব্য সংকট যশোরের নওয়াপাড়া নৌবন্দরের কার্যক্রমকে স্থবির করে ফেলেছে। কোনো ধরনের উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বন্দরে। অথচ প্রতিনিয়ত বন্দর দিয়ে বাড়ছে পণ্য পরিবহন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বন্দরটি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় হলেও কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, সড়ক, রেল ও নদীপথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্হার কারণে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নওয়াপাড়ায় সার, খাদ্যশস্য ও সিমেন্ট ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে। ক্রমেই এলাকাটি পরিণত হয় দেশের অন্যতম বড় বিপণন কেন্দ্রে। আমদানি করা সার ও খাদ্যশস্য চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে বড় জাহাজ থেকে খালাসের পর তা ছোট বার্জ ও কার্গোতে করে নদীপথে নওয়াপাড়া বন্দরে আনা হয়। এছাড়া ভারত থেকে স্হলপথে যেসব পণ্য আমদানি করা হয় তার বেশির ভাগ রেলের ওয়াগনে দর্শনা স্হলবন্দর হয়ে নওয়াপাড়ায় আনা হয়। এসব পণ্য সড়ক ও নদীপথে দেশের বিভিন্ন স্হানে নিয়ে যাওয়া হয়।
সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের এপ্রিলে যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়ায় নৌবন্দর স্হাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০০৭ সালের মে মাসে শুরু হয় বন্দরটির নির্মাণকাজ। ভৈরব নদের চেঙ্গুটিয়া থেকে ভাটপাড়া ফেরিঘাট পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা নির্ধারণ করা হয় বন্দরের জন্য। বন্দরটি ব্যবহার করে মূলত সার, সিমেন্ট, কয়লা, গমসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করা হয়। বর্তমানে প্রতি বছর ৪ হাজারের বেশি জাহাজে ২০ লাখ টনের অধিক পণ্য আসছে এ বন্দরে।
বর্তমানে বন্দরটিতে থাকা আটটি জেটি ও একটি পন্টুন কোনো কাজে আসছে না বলে জানান ব্যবসায়ীরা। পণ্য আমদানির পর খালাস করার জন্য এগুলো নির্মাণ করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এসব জেটি ও পন্টুন ব্যবহারে খরচ বেশি হওয়ায় তা ব্যবহার করছেন না ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, নদীর তীর থেকে জেটি ও পন্টুন অনেক দূরে হওয়ার কারণে শ্রমিক খরচ ও সময় বেশি ব্যয় হয়। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গাইডওয়াল নির্মাণের দাবি জানান ব্যবসায়ীরা।
নোয়াপাড়া ট্রেডার্সের প্রধান (সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং) মিজানুর রহমান জনি বলেন, নদীর নাব্য সংকটের কারণে কার্গোগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। জোয়ারের সময়ও লাইটার জাহাজ ঘাটে ভিড়তে পারে না। সিঁড়ি জোড়া দিয়ে শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে। দেরিতে আনলোডের কারণে ব্যবসায়ীদের জাহাজের ডেমারেজও গুনতে হয়। সরকার গ্রুপের চেয়ারম্যান আলমগীর সরকার বলেন, নাব্য সংকটের কারণে জাহাজ থেকে পণ্য আনলোড করতে ৩০ দিনও লেগে যায়। আর্থিক ক্ষতি হয়।
বিআইডব্লিউটিএর একটি প্রতিনিধি দল ১৯ আগস্ট নওয়াপাড়ায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেন। দলনেতা কতৃর্পক্ষের অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দীন মোবাইলে ইত্তেফাককে বলেন, এখানকার মূল সমস্যা নাব্য সংকট। ড্রেজিং করেও নাব্য সংকট দূর করা যাচ্ছে না। দুই পাশ ভরাট হয়ে আছে। কিছু ব্রিজের স্প্যানের প্রভাবেও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। শ্রমিকরা লোড-আনলোড ঝুঁকিপূর্ণভাবে করে। তিনি বলেন, মাল্টিপোল ট্রান্সপোর্ট (সড়ক, নদী, রেল) হাব হিসেবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। পরিকল্পিতভাবে আধুনিক ব্যবস্হাপনায় নিয়ে আসার জন্য একটি প্রকল্প প্রণয়ন করে ঊর্ধ্বতন মহলের বিবেচনার জন্য পেশ করা হবে।
বিআইডব্লিউটিএ নওয়াপাড়া নৌবন্দরের উপ-পরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, অস্বাভাবিকভাবে নদীতে পলি আসছে। পলি অপসারণ করে ফেলার জায়গাও নেই। ভৈরব নদে জোয়ারভাটা না থাকার কারণে পলি ওপরের (যশোরের) দিকে যেতে পারছে না। এতে করে নাব্য সংকট দেখা দিচ্ছে। ড্রেজিংয়ে কাজ হচ্ছে না। তবে তিন দফায় ১০৯টি অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদ করায় কিছুটা সুফল পাওয়া গেছে।
