নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকরা বাড়তি শ্রম দিয়ে আয় বাড়াতে চাইছেন। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শ্রমিকদের বেঁচে থাকার মতো ব্যয় নির্বাহে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা। এই দাবির জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, মালিকরা শ্রমিকদের ভালো চান। তাদের যেমন অর্ধাহারে দেখতে চান না, আবার মালিকরাও ব্যয় সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ুক, তাও দেখতে চাই না। এ ক্ষেত্রে একটি মধ্যপন্থা খুঁজে বের করার কথা বলেছেন তিনি। গতকাল বুধবার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে এ বিষয়গুলো উঠে আসে।
পোশাক খাতে সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি: শোভন কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে কি?’ শিরোনামে আয়োজিত ওই সংলাপে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এতে বিভিন্ন স্তরের শ্রমিক নেতা এবং মালিক সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকরা চরম সংকটে রয়েছে দাবি করে গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ বলেন, যে আয় আছে তা দিয়ে শ্রমিকরা চলতে পারছে না। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতেই বাড়তি পরিশ্রম করে তার জীবন ধ্বংস করছে। একজন শ্রমিক আট ঘণ্টার জায়গায় ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করছে। হাড়ভাঙা অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে ইতিমধ্যে কেউ কেউ মারাও গেছে। অথচ মালিকরা মনে করেন শ্রমিকরা ভালো আছে। শ্রমিক নেত্রী কল্পনা আক্তার দাবি করেন, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, শ্রমিকদের বেঁচে থাকার কষ্ট আরও বেড়েছে।
সংলাপে উপস্থাপিত প্রবন্ধে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, করোনা কেটে যাওয়ার পর পোশাক খাতের শ্রমিকের কাজ করার হার ২০ শতাংশ বেড়েছে। কিন্তু আশঙ্কাজনক হলো, গার্মেন্ট শিল্পে দেশে নারী শ্রমিক একটা সময় ৮৫ শতাংশ ছিল, সেটি ধীরে ধীরে কমে ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। কেন এই নারী শ্রমিকের আধিক্য পোশাক খাতে কমে এলো, তা নিয়ে গবেষণার দাবি রাখে।
তিনি জানান, শ্রমিকের আয়ের তুলনায় ব্যয় সাড়ে ৯ শতাংশ বেড়েছে। ব্যয় সামলাতে তারা এখন আগের থেকে বেশি কাজ করছে। এতে ৮৪ শতাংশ কারখানায় অতিরিক্ত কাজের চাপের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পোশাক কারখানাগুলোতে গড়ে ৪০ জন করে শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নারী শ্রমিকের প্রতি যৌন হয়রানি কমলেও সাম্প্রতিক সময় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সাবকন্ট্রাক্টের কারখানায় বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রবন্ধে।
এসব বক্তেব্যের জবাবে নিট পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম বলেন, আমরা আসলে সমস্যাগুলো আগে দেখি যাতে সমাধানটা বের করা যায়। সে কারণে সমস্যাগুলোই সবার সামনে আগে আসে। তিনি বলেন, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেওয়া হচ্ছে না এই দাবিও সঠিক নয়। বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম বলেন, দেশে এখন ১১৩৬ ইউনিয়ন আছে। ফলে ইউনিয়ন করতে দেওয়া হচ্ছে না- এই দাবি সঠিক নয়। নারী শ্রমিকের ঘাটতির পেছনে নারীর কাজে দক্ষতার ঘাটতিকেই দায়ী করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের আয়, পোশাক-আশাক, চলনেবলনে ও দক্ষতায় আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। এসব কারণে পোশাক খাতেও সমৃদ্ধি বেড়েছে। শ্রমিকের বর্তমান সংকট মালিক, শ্রমিক ও সরকার সম্মিলিতভাবে দূর করবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদেরকে একটি ব্যালেন্স ওয়ে আউট বের করতে হবে। সমস্যা থাকবে। এর জন্য আমাদের সবাইকে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। একে অপরের প্রতি দোষারপ না করে আন্তরিকতার সাথে চেষ্টা করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকেও এ সব ক্ষেত্রে আরও পরিস্থিতির উন্নতির তাগাদা রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কারখানায় শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় দর-কষাকষির জন্য ট্রেড ইউনিয়ন থাকা দরকার। আমরাও সেটা চাই। শ্রমিকদের স্বার্থ, সুযোগ, সুবিধা দেখার দায়িত্বও কারখানার মালিকের। উভয়ে মিলেমিশে কাজ করলে শোভন বা ডিসেন্ট কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা সম্বব হবে।
