এরশাদ শিকদারের মেয়ে এশার আত্মহত্যা

প্রেমিক প্লাবনকে আসামি করে চার্জশিট শিগগির

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৫৪

খুলনার বহুল আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ফাঁসি কার্যকর হওয়া এরশাদ শিকদারের মেয়ে জান্নাতুল নওরীন এশার (২২) মৃত্যুর ঘটনায় তার প্রেমিক প্লাবন ঘোষের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ আনা হচ্ছে। এশার মৃত্যুর ঘটনায় তার মা সানজিদা আক্তার শোভার দায়ের করা মামলার শিগগির চার্জশিট দিবে গুলশান থানা পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য, আসামি প্লাবন ঘোষ আদালত থেকে জামিন নিয়েছেন। প্লাবন ঘোষের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এশার। সেই প্রেম থেকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে প্লাবন ঘোষ তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই এশা প্লাবন ঘোষকে ভিডিও কলে রেখে বাসার বেড রুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। এ ব্যাপারে গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, এশার বাসা থেকে উদ্ধার করা মোবাইল ফোন ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে তদন্ত করার পর নিশ্চিত হওয়া গেছে এই আত্মহত্যায় প্লাবন ঘোষের প্ররোচনা রয়েছে। এশার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশ হাতে পেয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তার দুই হাতে ব্লেড দিয়ে কাটা জখমের চিহ্ন রয়েছে। তবে তার মৃত্যু ‘আত্মহত্যাজনিত কারণ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ক্রাইম সিন আলামতের সিআইডির পর্যবেক্ষণের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া ভিকটিম ও আসামির ডিএনএ (ডি-অক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্টও এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। আমরা এসব রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি। রিপোর্ট হাতে পেলেই আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলাটির চার্জশিট দাখিল করা হবে।

গত ৩ মার্চ রাতে গুলশান থানাধীন শাহজাদপুরের সুবাস্তু নজরভ্যালী অ্যাপার্টমেন্টের একটি ফ্ল্যাটে প্রেমিক প্লাবন ঘোষকে ভিডিও কলে রেখে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন এশা। পরদিন ভোরে গুলশান থানা পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। ঐ দিনই এশার মা এরশাদ শিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা আক্তার শোভা গুলশান থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা করেন। মামলায় এশার প্রেমিক প্লাবন ঘোষকে আসামি করা হয়। মামলার পর থেকেই প্লাবন ঘোষ পলাতক বলে দাবি করছে গুলশান থানা পুলিশ।

এশার মা সানজিদা আক্তার শোভা বলেন, বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিকের ছেলে প্লাবন ঘোষ। প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর সন্তান হওয়ায় পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবেই প্লাবনকে গ্রেফতার করছে না। পুলিশ চাইলেই আসামিকে গ্রেফতার করতে পারত। পুলিশের গড়িমসির কারণে সময় পেয়ে প্লাবন ঘোষ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এশার বান্ধবী সুমী বলেন, এশার সঙ্গে আমার ১৫ বছরের সম্পর্ক। ছোটবেলা থেকে একসঙ্গে লেখাপড়া করেছি। ঘটনার আট মাস আগে প্লাবনের সঙ্গে এশার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্লাবন হিন্দু ধর্মের হওয়ায় দুই পরিবারের কেউই তাদের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেনি। এজন্য বিয়েও করতে পারেনি। এসব নিয়ে প্লাবনের সঙ্গে এশার প্রায়ই ঝগড়া হতো।

তিনি আরো বলেন, এশার যেদিন মৃত্যু হয়, সেদিনও প্লাবনের সঙ্গে সন্ধ্যায় তার ঝগড়া হয়। ঐ ঝগড়ার জের ধরে এশা তার দুই হাত ব্লেড দিয়ে রক্তাক্ত করে ভিডিও কল দেয়। তাতেও প্লাবন বিয়েতে রাজি না হয়ে উলটো বিবাদে জড়ায়। একপর্যায়ে প্লাবন ঘোষকে ভিডিও কলে রেখেই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে এশা।

এশার মামাতো ভাই এসএম সাদিকুল আলম রুশো বলেন, এশা সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছে। শাহজাদপুরে সুবাস্তু টাওয়ারে মায়ের সঙ্গে থাকত। পড়াশোনা অবস্থায় আট মাস আগে প্লাবনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে। এরপর থেকেই পরিবারের সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণ করত এশা। এ নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঐ ছেলে ভিন্ন ধর্মের হওয়ায় দুই পরিবারের মধ্যে সমস্যা চলছিল। এসব নিয়ে প্লাবনের সঙ্গে এশার প্রায়ই ঝগড়া হতো।

প্রসঙ্গত, খুলনার এরশাদ শিকদার ১৯৯৯ সালে গ্রেফতার হন। এরশাদ শিকদার গ্রেফতার হওয়ার চার-পাঁচ মাস পর তার দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা আক্তার শোভার গর্ভে এশা জন্মগ্রহণ করেন। ২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এরশাদ শিকদারের দ্বিতীয় স্ত্রী সানজিদা আক্তার শোভা। শোভা খুলনার মেয়ে। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবীর স্ত্রী। পরকীয়ায় জড়িয়ে এরশাদ শিকদারকে বিয়ে করেন। এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর শোভাকে এরশাদ শিকদারের বাড়ি স্বর্ণকমল থেকে বের করে দেন প্রথম স্ত্রী ও অন্যরা। এরপর তিনি খুলনায় কিছু দিন পার্লার ব্যবসা করেন। তারপর চলে যান ঢাকায়। অন্যদিকে এরশাদ শিকদারের প্রথম স্ত্রী খোদেজা বেগমের তিন সন্তান রয়েছে। তারাই বর্তমানে এরশাদ শিকদারের রেখে যাওয়া সম্পত্তি ভোগদখল করছেন।

ইত্তেফাক/ইআ