বুধবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৫ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

নতুন পরমাণু সমঝোতা লাভবান হবে কে?

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৩৩

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি পরমাণু সমঝোতার কথা বিবেচনা করছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে ২০১৫ সালে করা চুক্তি থেকে ফিরে গিয়েছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার ফসল ছিল ঐ চুক্তি। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর ইউরোপের দেশগুলো অচলাবস্থা নিরসন করতে পারেনি। যদিও ছয়টি দেশের সঙ্গে চুক্তিটি হয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট না থাকায় চুক্তি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ইরানের সঙ্গে নতুন একটি সমঝোতায় না আসলে তেহরান আগামী বছর দশেকের মধ্যে পরমাণু বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানা গেছে, বাইডেন প্রশাসন যে চুক্তি করতে চাইছে তাতে এমন সুযোগ রাখা হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে কোনো মার্কিন সরকার ঐ চুক্তি থেকে সরে গেলেও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অধিকার থাকবে। পরমাণু কর্মসূচি থেকে ইরানকে ফিরিয়ে আনতে পশ্চিমা দেশগুলো আলোচনা থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত সব পদ্ধতিই ব্যবহার করেছে। বাকি ছিল কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা। এ অবস্থায় কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও একটি চুক্তি করাই বাঞ্ছনীয় মনে করছে ওয়াশিংটন। তবে চুক্তি হলেই ইরানকে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী হওয়া আটকানো যাবে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। এর জবাব হলো চুক্তি করে এটি পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শান্তিপূর্ণ কাজে পরমাণু শক্তির ব্যবহার এবং বোমা তৈরির জন্য পরমাণু শক্তির ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য আছে। শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মধ্যে আছে চিকিত্সা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে পরমাণু শক্তি ব্যবহার করা। এজন্য দরকার হয় পরিশোধিত ইউরেনিয়াম। এখন এই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রার ওপর নির্ভর করছে এর ব্যবহার শান্তিপূর্ণ কাজের মধ্যে সীমিত থাকবে না অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহার হতে পারে। ২০১৫ সালে সম্পাদিত জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তিতে আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্প মনে করতেন, ইরানকে দেওয়া ঐ সীমার মধ্যে থাকবে না এবং সুযোগ মতো দেশটির পরমাণু শক্তিধর হয়ে উঠবে। এই কারণ দেখিয়ে তিনি ২০১৮ সালে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যান।

পরমাণু ইস্যুতে মার্কিন নীতি কী আমরা যদি আরেকটু আগের দিকে ফিরে যাই ডুয়েট আইসেন হাওয়ার (১৯৫৩ থেকে ’৬১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন) প্রথম পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের জন্য একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এনপিটি বা নন প্রলিফারেশন ট্রিটি নামে পরিচিত চুক্তিটি ১৯৬৮ সালে সই হয়। আইসেন হাওয়ারের নীতি ছিল, পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী নয় এমন কোনো দেশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ করতে পারবে না। এমন কি বন্ধুদেশ হলেও না। মেক্সিকো, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভিয়েতনামের মতো অনেক দেশের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি আছে। এই দেশগুলো ফ্রান্স, জার্মানি বা রাশিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর দেশ থেকে সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম জ্বালানি আমদানি করে থাকে। সমস্যা হলো ইরানের পক্ষে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সেটি বিদেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব নয়। কারণ, এটি তাদের জাতীয় মানমর্যাদার বিষয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার একটি পরমাণু শিল্প রয়েছে। কিন্তু তারা নিজেদের জ্বালানি নিজেরা তৈরি করে না। তাহলে ইরানের নিজস্ব জ্বালানি উত্পাদন কেন এত প্রয়োজন। ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ঠেকাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আটটি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৫ তেহরানের জন্য পরমাণু জ্বালানি তৈরির সুযোগ রেখে জেসিপিওএ চুক্তিটি হয়। সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও এর মাধ্যমে পরমাণু অস্ত্র যে একেবারেই তৈরি হবে না ঐ চুক্তি সেটাও নিশ্চিত করেনি। এখন যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া ছাড়া আর কী বিকল্প থাকতে পারে, সে প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই আসে। সেরকম কিছু হলেও যে ইরানের কর্মসূচির পরিসমাপ্তি ঘটবে সেটাও হলফ করে বলা যায় না। কারণ ইরান তখন দুর্গম কোনো জায়গায় পরমাণু স্থাপনা নতুন করে তৈরি করতে পারে।

পরমাণু প্রযুক্তি এমনই যে, এটি যখন কোনো দেশের আয়ত্তে এসে গেলে স্থাপনা ধ্বংস হলেও প্রযুক্তি হাতছাড়া হয় না। তাছাড়া বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগ খুব সহজ হবে না। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ভার্চুয়ালি যুদ্ধের মধ্যে আছে। এ অবস্থায় লড়াইয়ের তৃতীয় আরেকটি ফন্ট খোলা নিশ্চয়ই ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণী মহল চাইবে না।

 

ইত্তেফাক/ইআ