২০১৫ সালেই রানি ভিক্টোরিয়ার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তার আগে এত দীর্ঘ সময় কেউ ব্রিটেনের সিংহাসনে বসেননি। ব্রিটেনের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসাবে তাঁর কার্যকালে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসেছেন ১৫ জন। আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসেছেন ১৪ জন। ব্রিটেনবাসীর কাছে ‘রানি আর রাজতন্ত্র এখন সমার্থক’। এ কথা মাস কয়েক আগে বলেছিলেন খোদ রাজতন্ত্রেরই কট্টর সমালোচক গ্রাহাম স্মিথ।
লন্ডনের মেফেয়ারে ইয়র্কের ডিউক এবং ডাচেস (পরে রাজা জর্জ এবং রাণী এলিজাবেথ)-এর প্রথম সন্তান এলিজাবেথ আলেকজান্ড্রা ম্যারি। সময়টা ১৯২৬ সালের ২১ এপ্রিল। তার বাবা ১৯৩৬ সালে নিজের ভাই রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের পর সিংহাসনে বসেন। তখন থেকেই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন ১০ বছরের এলিজাবেথ।
তখন থেকেই মেয়ের প্রশিক্ষণের উপর কড়া নজর রাখতে শুরু করেন রানি এলিজাবেথ বাওয়েস-লিওন। বাড়িতে এসে তাকে ইতিহাস, ভাষা, সঙ্গীতের পাঠ দিতেন বিখ্যাত শিক্ষকরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এলিজাবেথ আর বোন মার্গারেটকে লন্ডনের বাইরে স্কটল্যান্ড এবং উইন্ডসরে পাঠিয়ে দেন রাজা।
১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর দূরের এক তুতো ভাই লেফটেনান্ট ফিলিপ মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে বিয়ে হয় এলিজাবেথের। পরের বছর ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর জন্ম হয় প্রথম সন্তান প্রিন্স চার্লসের। ১৯৫১ সালে অসুস্থ হয়ে পড়েন রাজা অ্যালবার্ট। তখন থেকে তার প্রতিনিধিত্ব করে স্বামীর সঙ্গে বিদেশ সফরে যেতে শুরু করেছিলেন এলিজাবেথ।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড সফরে বেরিয়েছিলেন রানি এলিজাবেথ। সঙ্গে প্রিন্স ফিলিপ। পথে কেনিয়া নেমেছিলেন। সেখানেই রাজার মৃত্যুর খবর পান। তড়িঘড়ি দেশে ফিরে আসেন এলিজাবেথ। তখন তার বয়স মাত্র ২৫।
১৭ বছরের অপেক্ষায় অবসান ঘটে ১৯৫৩ সালে। এ বছরের ২ জুন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মুকুট মাথায় নেন ২৭ বছরের এলিজাবেথ। তবে এক বছর আগে ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজা জর্জ মারা গেলে, সেদিনই রানি হন এলিজাবেথ।
তার বাবা প্রিন্স অ্যালবার্ট, ডিউক অব ইয়র্ক ছিলেন রাজা পঞ্চম জর্জের ছোট ছেলে। বড় ছেলে অষ্টম এডওয়ার্ডের রাজা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বিবাহ-বিচ্ছিন্নাকে বিয়ে করার কারণে রাজা হতে পারেননি। ১৯৩৬ সালের ১১ ডিসেম্বর ব্রিটেনের রাজা হন এলিজাবেথের বাবা প্রিন্স অ্যালবার্ট।
শোক করার আর সময় পাননি তরুণী রানি। তত দিনে প্রথম ছেলে চার্লসের পর একমাত্র মেয়ে প্রিন্সেস অ্যানের জন্ম দিয়েছেন। দুই শিশু সন্তানকে দেশে রেখেই ১৯৫৩ সালের নভেম্বরে ছ’মাসের জন্য কমলওয়েলথভুক্ত দেশের সফরে বেরিয়েছিলেন রানি এলিজাবেথ। সঙ্গে স্বামী ডিউক অব এডিনবরা, ফিলিপ। শিশু সন্তানদের অবহেলা করেছেন, এই অভিযোগ বার বার উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। সমালোচনার মুখেও পড়েছিলেন। সব সময় পাশে থাকেননি স্বামীও। বাবার আদরের লিলিবেথ অবশ্য কর্তব্যকেই অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন বরাবর।
১৯৫৩ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড দিয়ে এলিজাবেথের ছ’মাসের কমনওয়েলথ সফর শুরু। এলিজাবেথের আগে ব্রিটেনের অন্য কোনও শাসক ওই দুই দেশে যাননি। ১৯৬১ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ সফরে এসেছিলেন রানি। তার আগে ৫০ বছর ব্রিটেনের কোনও শাসক এদেশে পা রাখেননি। এলিজাবেথের আগে কোনও ব্রিটিশ শাসক দক্ষিণ আমেরিকাতেও যাননি। সে দিক থেকে পূর্বতন ব্রিটিশ শাসকদের রক্ষণশীলতা অনেকটাই ভেঙেছিলেন রানি।
১৯৯৭ সালে যুবরানী ডায়নার মৃত্যুর পর রানির বিরুদ্ধে সমালোচনার বহর আরও বেড়ে গিয়েছিল। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই মুখে কুলুপ এঁটে এড়িয়ে গিয়েছিলেন যাবতীয় সমালোচনা। তার পর কালের নিয়মে থেমে গিয়েছে সব। জীবদ্দশায় কোনও দিন সংবাদ মাধ্যমকে কোনও সাক্ষাৎকার দেননি। ১৯৯৭ সালে শুধু এক বার একটি ভাষণে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিকরা ব্যালট বাক্সে প্রত্যাখাত হন। আর আমাদের, রাজ পরিবারের সদস্যদের জন্য এই প্রত্যাখানের বার্তাটা অনেক কঠিন।’
এ বছরই রানির সিংহাসনে বসার ৭০ বছর পূর্তি হয়েছে। তবে উৎসব হলেও ঔজ্জ্বল্য ছিল না। কারণ ২০২১ সালের ৯ এপ্রিল মারা গিয়েছিলেন ডিউক অব এডিনবরা। রানির অভিষেকের ৭০ বছর পূর্তিতেও বিতর্ক রানির পিছু ছাড়েনি। সংবাদ মাধ্যমের দাবি, চার সন্তানের মধ্যে রানির সব থেকে প্রিয় যুবরাজ অ্যান্ড্রু। সেই যুবরাজের বিরুদ্ধে আমেরিকায় যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। তার জেরে সামরিক খেতাব ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। হারিয়েছেন রাজ পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতা।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এই ব্রিটিশ শাসক প্রায়শই প্রজাতন্ত্রের অনুভূতি এবং রাজপরিবারের চাপে সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন। ১৯৯৭ সালে পুত্রবধূ ডায়ানার মৃত্যুর পর, ব্যাপক সমালোচিত হন এলিজাবেথ।
গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে স্কটল্যান্ডের বালিমোর ক্যাসেলে অবস্থান করছিলেন রানি। সেখান থেকেই রানির অসুস্থতার কথা প্রথম প্রকাশ হয়। জানানো হয়, চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ দিতে লন্ডনের বাকিংহ্যাম প্যালেসে ফিরতে পারবেন না রানি। তাই রানির ৭০ বছরের শাসনামলে এই প্রথম স্কটল্যান্ড থেকে নিয়োগ দেয়া হয় লিজ ট্রাসকে।
এর দু’দিন পর বৃহস্পতিবার নতুন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নির্ধারিত একটি বৈঠক বাতিল করেন রানি। জানানো হয়েছিল, রানির শারীরিক অবস্থা গুরুতর। চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে আছেন তিনি। অবশেষে লন্ডন সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করে বাকিংহ্যাম প্যালেস।

