রোববার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ডলারের নির্ধারিত দাম বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৭:০২

ডলারের সংকট নিরসনে ব্যাংকগুলো নিজেরাই সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করেছে। রপ্তানি, প্রবাসী আয় ও আমদানিতে ডলারের দাম কত হবে, তার সীমা ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু এ দর ঠিক রাখা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, ডলারের একক হার হিসেবে যে বিনিময় মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় অর্থনীতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক ড. মইনুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, যে দর বাফেদা-এবিবি নির্ধারণ করে দিয়েছে তা এ মুহূর্তে বাস্তবায়ন করা খুব কঠিন হবে। কারণ বাস্তবতার নিরিখে বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে ডলার বেচাকেনা হবে। বাজারে দুটো রেট থাকবে। একটি হলো যেটি তারা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটি, আরেকটি হলো কালোবাজার বা কার্ব মার্কেট। কালোবাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে সেখানে বেশি দামে ডলার বেচা কেনা হবে। দুই বাজারের পার্থক্য কমাতে না পারলে সিদ্ধান্তটি ফলপ্রসূ হবে না। দাম নির্ধারণ করে দিয়ে বাস্তবায়ন খুব কঠিন ব্যাপার। বাজারে মনিটরিং করা খুব সহজ ব্যাপার নয় বলে মনে করেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, যে দর বাফেদা-এবিবি নির্ধারণ করে দিয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হবে কি না তা ভবিষ্যতে দেখা যাবে। ডলারের বিনিময় মূল্য এখনো চাপের মুখে আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক নেমে গেছে। তবে অন্যদিকে আমদানি কমানোর চেষ্টা করা হবে। ব্যাংকগুলো হয় এলসি খোলা কমিয়ে দেবে। যে কারণে রপ্তানিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। কারণ পণ্য উত্পাদনে আমরা কাঁচামালের অতিরিক্ত নির্ভরশীল। যা আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ডলারের নির্ধাররিত দাম ধরে রাখা সংশয় আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।        

অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ভালো ফল দেবে না। বাজারের চাহিদা-জোগান বিবেচনায় নিয়ে একটা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা না হলে বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসবে না। এক বাজারে ডলারের দুই দাম হতে পারে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যাংকারদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ বা এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রার ডিলার ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন বা বাফেদা ঠিক করেছে যে, এখন থেকে রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ডলারের বিনিময় হার হবে সর্বোচ্চ ১০৮ টাকা। তবে রপ্তানি আয় নগদায়ন হবে সর্বোচ্চ ৯৯ টাকায়। আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তির সময় ডলারের দাম হবে সর্বোচ্চ ১০৪ টাকা ৫০ পয়সা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে পণ্য ও জ্বালানি মূল্যের উল্লম্ফনের কারণে দেশে দেশে ডলারের বিপরীতে মুদ্রার যে অবমূল্যায়ন সমস্যা দেখা দিয়েছে, তা থেকে বাদ নয় বাংলাদেশও। প্রায় দেড় বছর ডলারের দর ৮৪ টাকা ৮০ পয়সায় স্থিতিশীল থাকলেও গত বছরের আগস্ট থেকে বাড়তে বাড়তে আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে তা উঠে গেছে ৯৫ টাকায়, কিন্তু খোলাবাজারে এক পর্যায়ে কেনাবেচা হতে থাকে ১২০ থেকে ১২১ টাকায়। সেখান থেকে কিছুটা কমলেও ডলারের দর নিয়ে উদ্বেগ এখনো যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরেও ডলার বিক্রি অব্যাহত রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশি মুদ্রা টাকার বিপরীতে আমেরিকান মুদ্রা ডলারের দৌড় থামাতে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (২ মাস ১১ দিন) ২৭০ কোটি (২.৭০ বিলিয়ন) ডলার বিক্রি করা হয়েছে। এর পরও বাজারে ডলারের সংকট কাটছে না। তবে চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ফের বাড়তে শুরু করেছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়ও কমা শুরু করেছে। তবে এর মধ্যেও গত ২৬ মাসের মধ্যে প্রথম বারের মতো বাংলাদেশের রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়নের ঘরে নেমে গেছে।

এদিকে সব ব্যাংকের জন্য ডলারের অভিন্ন মূল্য সোমবার থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। কিন্তু তা কার্যকর করেনি কোনও ব্যাংক। তবে  মঙ্গলবার থেকে ডলারের নতুন দর কার্যকর করা হবে বলে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সোমবার বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও এবিবি ও বাফেদার বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত কার্যকর করেনি। 

ইত্তেফাক/ইআ