জোড়া মাথা আলাদা হওয়ার পর হাসিখুশি আর পড়াশোনায় সময় কাটছে রাবেয়ার। তাকে স্কুলে পেয়ে খুশি তার সহপাঠী-শিক্ষকরা। রাবেয়ার মাথায় খুলি না থাকায় মস্তিষ্ক ঢাকা রয়েছে শুধু চামড়ায়। তবে প্রতিবন্ধকতায় বেড়ে ওঠা যমজ বোন রোকাইয়া কথা বলা, খাওয়া, গোসল, চলাফেরা কোনোটাই করতে পারে না। তাই জটিল অপারেশন শেষে বাড়ি ফেরার দেড় বছর পরও দুই মেয়েকে নিয়ে নানা সংকট আর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন শিক্ষক দম্পতি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৬ জুন সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নেয় জোড়া মাথার যমজ শিশু রাবেয়া-রোকাইয়া। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি করা হয় রাবেয়া-রোকাইয়াকে। চিকিৎসা শেষে জোড়া মাথা আলাদা হয়ে সাড়ে তিন বছর পর ২০২১ সালের ১৫ মার্চ বাড়িতে ফেরে আলোচিত যমজ শিশু রাবেয়া-রোকাইয়া। সেদিন তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন স্বজন-প্রতিবেশী আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় বছর। যমজ দুই বোনের বয়স এখন ছয় বছর পার করে সাত বছরে। হাসিখুশি আর খেলাধুলায় সময় কাটছে রাবেয়ার। যাচ্ছে স্কুলেও। আটলংকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির ছাত্রী সে। সহপাঠীদের সঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলা, গানে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখা যায় তাকে। রাবেয়াকে পেয়ে খুশি তার সহপাঠী, শিক্ষকরাও। তবে খুব একটা ভালো নেই যমজ আরেক বোন রোকাইয়া।
রাবেয়া-রোকাইয়ার মা আটলংকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা তাসলিমা খাতুন বলেন, রোকাইয়াকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। ও প্রতিবন্ধী হিসেবে বেড়ে উঠছে। কথা বলা, খাওয়া, গোসল, চলাফেরা কোনোটাই করতে পারে না। খাবার খেতে গেলে গলায় আটকে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। মনে হয় এই বুঝি আমার মেয়ে চলে গেল। আর রাবেয়াকে নিয়ে স্কুলে যাতায়াতেও ভয়ে থাকতে হয়। কারণ ওর মাথার খুলি নেই। ব্রেনটা ঢাকা রয়েছে শুধু চামড়া দিয়ে। হঠাৎ পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেলে ওকে বাঁচানো যাবে না।
রাবেয়া-রোকাইয়ার বাবা চাটমোহর উপজেলার অমৃতকুন্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, রাবেয়া পুরোপুরি সুস্থ বলা চলে। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। সে স্কুলে যাচ্ছে, সবার সঙ্গে হাসিখুশিতে পড়ছে, খেলাধুলা করছে। কখনো চিন্তা করিনি আমার যমজ শিশু আলাদা হবে, স্কুলে যাবে, স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে।
দুই জন দুই স্কুলে শিক্ষকতা করতে গিয়ে শিশুদের দেখাশুনা বা যত্ন নেওয়ায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে উল্লেখ করে এই দম্পতি বলেন, যদি তাদের শহরের কাছাকাছি একই স্কুলে বদলি করা হয়, তাহলে ভালো হয়। এতে স্কুলের পাশে বাসা ভাড়া নিয়ে দুই মেয়েকে ভালোভাবে যত্ন ও দেখাশুনা করা যাবে। অন্যদিকে অর্থাভাবে রাবেয়া-রোকাইয়াকে ঠিকমতো থেরাপিও দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান। বলেন, দুই জনকে থেরাপি দেওয়া বেশ ব্যয়বহুল।
রাবেয়া জানায়, সে স্কুলে ভর্তি হয়ে খুব খুশি। নিয়মিত স্কুলে যায় সে। স্যার ও ম্যাডাম তাকে খুব ভালোবাসে। বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান সবকিছু করতে পেরে আনন্দের শেষ নেই তার। তার বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আমেনা খাতুন ও প্রধান শিক্ষিকা সাবিনা খাতুন বলেন, রাবেয়ার ব্রেন খুব তীক্ষ। ও পড়াশোনা, আচরণে ভালো মেয়ে।
চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. মমতাজ মহল বলেন, তারা সব সময় পরিবারটির খোঁজখবর রাখেন। রাবেয়া-রোকাইয়ার বাবা-মাকে একই স্কুলে বদলির বিষয়টি ভেবে দেখা হচ্ছে।
