বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

চাপে পুতিন

আপডেট : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১১:৪৩

চলতি বছরের গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এরপর আজ বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত টানা ২০৪ দিনে গড়িয়েছে। এর মধ্যে সম্প্রতি ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রুশ বাহিনীর পিছু হটার খবর পাওয়া যাচ্ছে। 

গতকাল মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি দাবি করেন, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণে তার সেনাবাহিনী রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে ৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে। যদি এই দাবি সত্যি হয়, তাহলে গত পাঁচ মাস ধরে রাশিয়া ইউক্রেনের যতটা জায়গা দখলে নিয়েছিল, ইউক্রেনীয় সেনারা মাত্র সাত দিনে তার চেয়ে বেশি এলাকা পুনর্দখল করেছে।

তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে তাদের সৈন্যদের পিছু হটার ঘটনাকে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে দেখানোর চেষ্টা চলছে। বারবার বলা হচ্ছে, ইউক্রেনে তাদের 'বিশেষ সামরিক অভিযানের' যে লক্ষ্য, তা অর্জিত হচ্ছে। 

কিন্তু রণক্ষেত্রের এই চিত্র পুতিন বিরোধীদের শক্তি বাড়িয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মিডিয়াতে, সোশাল মিডিয়াতে তারা ইউক্রেনে যুদ্ধ কৌশলে নিয়ে খোলাখুলি প্রশ্ন তুলছেন। এমনকি যুদ্ধের সমর্থকরাও হতাশা, ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা।

পুতিনের ঘোরতর সমর্থক হিসেবে পরিচিত চেচেন নেতা রমজান কাদিরভ খোলাখুলি বলেছেন, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সরকারের কৌশল নিয়ে তিনি সরাসরি পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে চান। কারণ সরকারের ভেতর অন্যদের ওপর তিনি ভরসা করতে পারছেন না।

আরও বেশ কজনের মত রুশ পার্লামেন্টে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা গেন্নাদি জুগানভ ইউক্রেনে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে জনগণকে এই লড়াইতে সম্পৃক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্দেহ নেই, দেশের ভেতর চাপে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট পুতিন। ইউক্রেনে রাশিয়ার পরিণতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে।

পুতিন তার দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করছেন যে ইউক্রেনের সামরিক অভিযানে তার কিছু সীমিত লক্ষ্য রয়েছে এবং সেগুলো তিনি অর্জন করেই ছাড়বেন।

কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সমর কৌশল বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মাহমুদ আলী মনে করেন, ইউক্রেনে প্রেসিডেন্ট পুতিন তার লক্ষ্য অর্জনে কতটা সুবিধা করতে পারছেন তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। 

তিনি বলেন, দাড়িপাল্লার নিক্তিতে ওজন করলে আপনি সাফল্য-ব্যর্থতা দুটোই দেখতে পাবেন। তার (পুতিনের) যদি লক্ষ্য হয়ে থাকে ইউক্রেন যেন কোনওভাবে ন্যাটো জোটের পুর্নাঙ্গ সদস্য না হতে পারে, সেটা নিশ্চিত করা - তাহলে তিনি তাতে আপাতত সফল হয়েছেন। 

'কিন্তু তার অন্যতম লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে জেলেনস্কিকে সরিয়ে রুশপন্থী কোন সরকার কিয়েভে বসানো, তাহলে তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। ইউক্রেন থেকে তিনি কি ন্যাটোকে সরাতে পেরেছেন? পারেননি,' বলেন আলী।  

কিন্তু তারপরও ইউক্রেনে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করতে পুতিন চাইছেন না। তার দ্বিধার অন্যতম কারণ হয়তো যে তাকে তখন সেনাবাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামুলক করতে হতে পারে, এবং তাতে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে জনমত বিগড়ে যেতে পারে।

কোন দিকে গড়াবে ইউক্রেন যুদ্ধ?

সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, পুতিন এখন কী করবেন? মস্কোতে বিবিসির সংবাদদাতা স্টিভ রোজেনবার্গ বলছেন, কেউ-ই তা জানে না। তবে, তিনি বলেন, একটি বিষয় সবাই জানেন যে মি পুতিন কখনও ভুল স্বীকার করার লোক নন, আর তিনি পিছু ফেরেন না।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন যে শীতের আগে ইউক্রেন দক্ষিণের খেরসন এবং ডনবাসে ব্যাপক পাল্টা হামলার পরিকল্পনা করছে এবং সেজন্য আমেরিকার কাছ থেকে আরও দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র চাইছে। রুশ সরকারের মধ্যে এখনও তেমন কোন অস্থিরতা চোখে পড়ছে না।

কিন্তু ইউক্রেনে যদি তিনি আরও কোণঠাসা হন, তাহলে পরমানবিক বা অন্য কোনো ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের পথে পুতিন যাবেন কি-না তা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্লেষক মহলে কানাঘুষো শুরু হয়েছে। 

অনেকেই সেই আশঙ্কা পুরোপুরি নাকচ করতে রাজি নন।

তবে ড. মাহমুদ আলী মনে করেন না যে রাশিয়া আদৌ পারমাণবিক বা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা বিবেচনা করছে। 'এটা ঠিক যে রাশিয়া কোনওভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দিতে চাইবে যাতে ক্রিমিয়া তাদের হাতছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়। কিন্তু পুতিন খুব ভালোভাবে জানেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিনতি কী হবে। তার নিজের দেশই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।' 

রাশিয়া এখন খেরসন এবং ডনবানের প্রতিরক্ষা সংহত করতে জোর পদক্ষেপ নেবে বলে মনে করেন ড. আলী। কিন্তু তার ধারণা, বেশি বিপদ দেখলে হয়তো যুদ্ধকে বিপজ্জনক মাত্রায় সম্প্রসারিত করবে রাশিয়া।

তিনি বলেন, দু'ভাবে রাশিয়া তা করতে পারে: প্রথমত, ইউক্রেন বাদে অন্যত্র যুদ্ধ শুরু করে দিতে পারে। অনেক সময় যুদ্ধরত কোন দেশ যখন মনে করে তারা জিততে পারছে না, তখন অস্থিরতা তৈরির জন্য সম্পূর্ণ অন্য জায়গায় যুদ্ধকে নিয়ে যেতে পারে। রাশিয়ার পক্ষে তা করা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, তাদের হাতে যে ভয়াবহ সব মারণান্ত্র রয়েছে - যেগুলো তারা এখনও ইউক্রেনে ব্যবহারই করেনি - সেগুলোর ব্যবহার শুরু করতে পারে।

ড. আলী বলেন, এখনও রাশিয়া তাদের সমরশক্তির সীমিত একটি অংশ ইউক্রেনে ব্যবহার করেছে- বিমান বাহিনীর খুব ছোটো একটি অংশ ব্যবহার করেছে, কিছু বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারই করেনি। যদি পরিস্থিতি সত্যিই একবারেই নাগালের বাইরে চলে যায়, আমরা হয়তো রাশিয়াকে তাদের সেই অব্যবহৃত বিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির করতে প্রয়োগ দেখবো।

গত এক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেন দেখাচ্ছে যে তারা বিস্ময় তৈরির ক্ষমতা রাখে - রাশিয়ার সমর শক্তি নিয়ে যে মিথ বা পুরাকথা চালু ছিল তা হয়তো অনেকটাই তারা ভেঙ্গে দিতে পেরেছে। তবে যুদ্ধ শেষ হতে হয়তো এখনও আরও অনেক দেরি হতে পারে। বিবিসি

ইত্তেফাক/এসআর