রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বামপন্থার দিকে ঝুঁকছে  শ্রীলঙ্কা

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৩:৫৯

শ্রীলঙ্কায় জুলাইতে গণআন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজপক্ষে বিদায় নেন। এর দুমাস আগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দ রাজাপক্ষে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন মার্চের মাঝামাঝি থেকে দানা বাধতে শুরু করে। জুলাইতে এটি চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছে। শেষ পর্যন্ত স্পিকার রনিল বিক্রমাসিংগে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন এবং পরিস্থিতি আয়ত্তে আনেন। দেশটির অবস্থা এখন তুলনামূলক শান্ত। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এতবড় গণবিস্ফোরণ আকস্মিক ঘটনা ছিল না। এর পেছনে বামপন্থিদের ভূমিকা রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে বামদের বড় ভূমিকায় কখনো দেখা যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে তারা বেশ সংগঠিত হয়েছে। শ্রমিক ও ছাত্রদের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিছু ছাত্র ও অধিকার সংগঠনের ডাকে ১৫ মার্চ থেকে শুরু হয়েছিল ‘গোটা গো গামা’ (গোটাবায়া গো হোম) আন্দোলন। তাদের দাবি ছিল রাজাপাকসে পরিববারের পদত্যাগ ও একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন। বাম ঘনিষ্ঠ ইউনিয়নগুলো প্রধান ক্যাম্প গেড়েছিল রাজধানী কলম্বোয়। বর্তমান প্রশাসন তাদের সেই ক্যাম্পগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এপ্রিল থেকে বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমিক সংগঠন একাত্মতা জানিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এছাড়া বহু সাধারণ নাগরিকও তাদের সঙ্গে ছিল। প্রত্যেকের দাবি ছিল মূলত একটিই—বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। নিজেদের দাবির কথা তুলে ধরতে তারা অবৈতনিক শিক্ষা, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং দুর্নীতি বিরোধী নানা স্লোগান দেয়। এসব স্লোগান মূলত বামরাই দিয়ে থাকে।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগের সঙ্গে বামধারার কোনো সম্পর্ক ছিল না। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে তাদের মধ্যে একটি ক্ষোভ ছিল। 
বামপন্থি দল ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার পার্টির সদস্য কুশালয়া আরিয়ারত্নে মনে করেন, তারা যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে রাজপথে স্লোগান দিতেন অল্পসংখ্যক মানুষই তাদের কথায় কান দিয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি সবাইকে রাজপথে নিয়ে এসেছে। ঐতিহাসিক কারণে শ্রীলঙ্কায় বামদের প্রতি মানুষের একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ কারণে বামদলগুলো মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও তারা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেনি। ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির মুখপাত্র পবুদু জয়াগোদা বলেন, ‘আমরা বিক্ষোভে অংশ নিলেও পৃথক ব্যানার বহন করিনি বা আমাদের পরিচয় প্রকাশ করিনি। পরিচয় প্রকাশ না করে আমরা গণবিক্ষোভে অবদান রেখেছি।’ বর্তমানে পার্লামেন্টে মাত্র তিনটি বাম দল রয়েছে, যাদের প্রত্যেকটিই ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। সাধারণ মানুষ ডান-বাম নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিই ভীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তবে বিক্ষোভ শুরুর ছয় মাস আগে থেকেই বাম দলগুলো মাঠে নামতে শুরু করেছিল। জনতাও এই আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করে। 

শ্রীলঙ্কার প্রথম বামদল ট্রটস্কিস্ট লঙ্কা সমা সামাজা পার্টি গঠিত হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত সংগ্রামে দলটি বিশেষ অবদান রয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে তারা ক্ষমতায় যায়নি। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৫৩ সালে তৎকালীন সরকার চালের ওপর ভর্তুকি উঠিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শ্রীলঙ্কার কমিউনিস্ট পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে তারা ধর্মঘট করে। তখনো পর্যন্ত তাদের প্রতি জনতার একাংশের সমর্থন ছিল। তবে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি। স্থানীয় পর্যায়ে চাল উৎপাদন ও ভূমি সংস্কারের দাবি নিয়ে আরো কয়েকটি সমমনা দলের সঙ্গে কোয়ালিশন করে তারা ক্ষমতায় গিয়েছিল। ঐ সরকার কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিলেও শেষ পর্যন্ত সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। 

কোয়ালিশনের শরিক ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা সিরিতুঙ্গা জয়সুরিয়া সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, ‘কৃষক, শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষ অনেক আশা নিয়ে আমাদের পার্লামেন্টে পাঠালেও কোয়ালিশন সরকার হওয়ায় তাদের আশা পূরণ করা যায়নি। এরপর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে। ১৯৭১ সালের মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি কোয়ালিশন থেকে বেরিয়ে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াকে পুঁজি করে তারা ঐ বিদ্রোহ করেছিল, তবে সরকার সেটি দমন করতে সক্ষম হয়। ১৯৭৮ সালে জুলিয়াস জয়বর্ধনে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। জয়বর্ধনের সরকার মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হয়। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বামপন্থিরা আবার সরব হয়। সরকার রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার ১৯৮০ সালের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর আন্দালন করে। দেশটিতে সেই থেকে এখনো পর্যন্ত ট্রেড ইউনিয়নগুলো এখনো শক্তভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। 

সময়ের বিবর্তনে বাম দলগুলো ভেঙেছে এবং নতুনভাবে গঠিত হয়েছে। দলত্যাগ ও ভাঙ্গাগড়ার এই খেলা একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। জয়বর্ধনের সময় নিষিদ্ধ জনতা বিমুক্তি পেরামুনা দলটি এখন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার। ২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে তারা এক তৃতীয়াংশ আসন পায়। অতি সম্প্রতি সরকার বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষের দাবি ছিল সরকার হটানো। কিন্তু তারপর কী হবে সে নিয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। বামপন্থি সেই শূন্যস্থানটি পূরণ করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ কী হতে পারে সে বিষয়ে জনসাধারণকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।

ইত্তেফাক/ইআ