বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাজকীয় আয়োজনে সমাহিত হলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০২:২৮

রাজকীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ও আড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে সমাহিত হলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রাজা তৃতীয় চার্লস, রাজপরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের অভ্যন্তরে অবস্থিত রাজা ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেল সমাধিতে রানিকে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় সমাধিস্থ করা হয়। যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় রাত ৯টা ১২ মিনিটে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রাজপরিবার। 'রয়্যাল ফ্যামিলি'র ওয়েবসাইটেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

উইন্ডসরের ডিন ডেভিড কনর রানিকে সমাহিত করার আনুষ্ঠানিকতা পরিচালনা করেন। এসময় ব্রিটেনের রানির ব্যক্তিগত দফতরের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রানির সমাধির ওপর খোদাই করা মার্বেলের ফলক যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে লেখা আছে ‘দ্বিতীয় এলিজাবেথ ১৯২৬-২০২২’।

রাজা ষষ্ঠ জর্জ ও প্রথম এলিজাবেথের সমাধি এটি। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই সমাহিত করা হয়েছে। ছবি: পিএ মিডিয়া

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের আগে রাজপরিবারের আরও অনেককে সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে সমাহিত করা হয়েছে। চ্যাপেলের বিভিন্ন অংশে ও রয়্যাল ভল্টে তাদের সমাহিত করা হয়। ১৪৭৫ সালে রাজা চতুর্থ এডওয়ার্ড এই চ্যাপেল প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬২ সালে ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেল হিসেবে আলাদা একটি অংশ প্রতিষ্ঠা করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, যেখানে শায়িত আছেন তার বাবা, মা ও বোন প্রিন্সেস মার্গারেট। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের স্বামী প্রিন্স (ডিউক অব এডিনবার্গ) ফিলিপকে আগে রয়্যাল ভল্টে সমাহিত করা হলেও তার কফিন স্থানান্তর করে ষষ্ঠ জর্জ মেমোরিয়ালে নিয়ে আসা হয়েছে। এতে করে শেষ শয্যায় একসঙ্গে হলেন রানি ও স্বামী ফিলিপ।

রানিকে সমাহিত করার আগে যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সময় বিকাল ৪টায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য সেন্ট জর্জ চ্যাপেলে কফিন নিয়ে যাওয়া হয়। রানির প্রয়াত স্বামী ফিলিপের শেষকৃত্যও এই গির্জায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানে সীমিত সংখ্যক অতিথি অংশ নেন। ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি রানির অন্তিমযাত্রার উদ্দেশে আশীর্বাদ জানান। তিনি বলেন, 'পরকালের শান্তির জীবনে যান। সেখানে আপনি যেন সত্য ও সুন্দরের সঙ্গে থাকতে পারেন, সকল অপশক্তি যেন দূরে থাকে। পবিত্র আত্মার বিশুদ্ধতায় ইশ্বরকে ভালোবাসুন ও ঈশ্বরের সেবা করুন। ঈশ্বর আপনার, আপনার বাবা ও ছেলের মঙ্গল করুন। আমিন।'

সেন্ট জর্জ চ্যাপেল। ছবি: উইকিপিডিয়া

তবে রানির শেষকৃত্য ও সমাহিতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও যুক্তরাজ্যে আরও এক সপ্তাহ ধরে শোক পালন করা হবে।

এর আগে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ওয়েস্টমিনস্টার হলে রানিকে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। রানির শেষকৃত্যে যোগ দিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধান ও নেতারা উপস্থিত হন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় চারদিন শায়িত থাকার পর রানিকে ওয়েস্টমিনস্টার হল থেকে সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানের জন্য ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে নিয়ে যাওয়া হয়। রয়েল নেভির স্টেট গান ক্যারেজে করে রানির কফিনটি টেনে নিয়ে যান নৌবাহিনীর ১৪২ জন কর্মকর্তা। সর্বশেষ প্রিন্স ফিলিপের চাচা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় এই গাড়ি ব্যবহার করা হয়। ১৯৫২ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের বাবা ষষ্ঠ জর্জের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়ও এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

১২৩ বছরের পুরনো এই গান ক্যারেজে করে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কফিন বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। ছবি: টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি ম্যাগাজিন

এসময় প্রিন্স উইলিয়াম, প্রিন্স হ্যারিসহ রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যরা শোকযাত্রায় অংশ নেন। সড়কে সারিবদ্ধভাবে রয়েল নেভি ও রয়েল মেরিনের সদস্যরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থেকে রানিকে শ্রদ্ধা জানান। পার্লামেন্ট স্কয়ারে তিন সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

বেলা ১১টায় ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে রানির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ হাজারো অতিথি এতে অংশ নেন। ডিন অব ওয়েস্টমিনস্টার ডেভিড হোয়েল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ জাস্টিন ওয়েলবি ধর্মীয় বক্তব্য দেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসও ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করেন। ১৯৪৭ সালে এই ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতেই প্রিন্স ফিলিপের সঙ্গে দ্বিতীয় এলিজাবেথের বিয়ে হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে রানির অভিষেক অনুষ্ঠানও এখানেই হয়েছিল।

রানির শেষকৃত্যানুষ্ঠান। ছবি: বিবিসি

বেলা ১২টার দিকে অন্তিম সুর ‘দ্য লাস্ট পোস্ট’ বাজানো হয়। এরপর জাতীয়ভাবে দুই মিনিটের নীরবতা পালনের পর দুপুর সোয়া ১২টায় রানির কফিনবাহী গাড়িটিকে টেনে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবে থেকে ওয়েলিংটন আর্চে নিয়ে যাওয়া হয়। কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশ নেতৃত্বে যাত্রাটি সাতটি ভাগে বিভক্ত ছিল, যার প্রতিটি ভাগের ছিল আলাদা বাদক দল। যুক্তরাজ্য এবং কমনওয়েলথের সেনাবাহিনী, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের সদস্যরাও এতে অংশ নেন। রাজা তৃতীয় চার্লস রাজপরিবারের সদস্যদের শোকযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।

রাস্তায় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন শত শত সামরিক সদস্য। রানিকে বহনকারী শবযান যাওয়ার সময় তারা মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রথমে মোটরওয়ে দিয়ে শবযান যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে বিভিন্ন এলাকার ভেতর দিয়ে শবযান নিয়ে যাওয়া হয়। রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ ফুল ছুঁড়ে দিয়ে রানিকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

রানির অন্তিম যাত্রা। ছবি: আল-বাওবা

দুপুর ৩টায় উইন্ডসর ক্যাসেলে ঢোকার জন্য পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ লং ওয়াকে আরেকটি শোকযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এই সড়কের দুই ধারে সেনাসদস্যরা দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে রাজা ও রাজপরিবারের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা উইন্ডসর ক্যাসেলে প্রবেশ করেন। বিকাল সাড়ে ৪টায় রাজা তৃতীয় চার্লস ও রাজপরিবারের সদস্যরা চ্যাপেল ছেড়ে যান। সবশেষে রানির কফিন সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলে রয়্যাল ভল্টে রাখা হয়। এরমধ্যে দিয়ে রানির শেষকৃত্যের প্রাকাশ্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরে রানির মুকুট, রাজকীয় গোলক ও রাজদণ্ড শেষবারের মতন সরিয়ে নেওয়া হয় কফিন থেকে।

সাত দশকেরও বেশি সময় ব্রিটিশ সিংহাসনে আসীন থাকার পর গত ৮ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে বালমোরাল প্রাসাদে মৃত্যুবরণ করেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। ব্রিটেনকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে শাসন করেছেন তিনি। লন্ডনের মেফেয়ারের ইয়র্কের ডিউক এবং ডাচেস (পরে রাজা জর্জ এবং রাণী এলিজাবেথ)-এর প্রথম সন্তান এলিজাবেথ আলেকজান্ড্রা ম্যারি। রানির এই মৃত্যু পরিণত বয়সে হলেও শেষকৃত্য নিয়ে দীর্ঘ আচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন আগে থেকেই ছিল। 'অপারেশন লন্ডন ব্রিজ' নামের সামরিক কার্যক্রমের পরতে পরতে ছিল রানির শেষযাত্রার নিপুণ পরিকল্পনা। রানির জীবদ্দশায় রাজত্বকালে বহুবার এ পরিকল্পনার হালনাগাদ করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এসটিএম