সোমবার, ০৩ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঘুমধুমের পর পুরো স্থলসীমান্তে আতঙ্ক, জাতিসংঘে রোহিঙ্গাদের চিঠি

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:১৪

নাইক্যংছড়ি ও কক্সবাজারজুড়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলসীমান্ত রয়েছে শতাধিক কিলোমিটার। এরমধ্যে নাইক্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন, ঘুমধুম ও উখিয়ার পালংখালীতে রয়েছে পায়ে হেঁটে পার হওয়ার মতো সীমানা। ২০১৭ সালে নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা এসব সীমানা হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছিল। এসব সীমানার নিকটবর্তী এলাকায় রয়েছে অনেক বসতি।

গত জুলাই থেকে সীমান্তের ওপারে সংঘাতের সৃষ্ঠি হচ্ছে। এদিকে ঘুমধুমের তুমব্রু ও আশপাশ এলাকার ওপারে গোলাগুলি চললেও সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার দিনব্যাপী উখিয়ার স্থলসীমান্তের ওপারে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেছে। 

মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে সারাদিন থেমে থেমে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমান পাড়া সীমান্তে নতুন করে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান স্থানীয়রা। একেকটি ভারী গোলার আওয়াজে প্রকম্পিত হয়েছে এপারের মাটি-বাসাবাড়ি। এমনটি জানিয়েছেন পালংখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী।

চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমার অভ্যন্তরে এতদিন গোলাগুলি হলেও মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রচণ্ড মর্টারশেল ও গুলির বিকট শব্দে কেঁপে উঠে পালংখালি সীমান্ত এলাকা। থেমে থেমে চলেছে সারাদিন। এ ঘটনায় পালংখালির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আঞ্জুমান পাড়া ও পূর্ব পারিরবিল এলাকার সীমান্তবর্তী মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছে।’

উখিয়া সীমান্ত। ছবি: ইত্তেফাক

তার মতে, আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাতের কথা বলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ঠেকাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে ওপারে সংঘাত সৃষ্টি করে আতঙ্ক ছড়িয়ে রাখছে বলে খবর পাচ্ছি। এপারে আশ্রয়ে থাকাদের প্রত্যাবাসন ব্যতিরেখে মিয়ানমার আরকান রাজ্যসহ আশপাশ এলাকায় বসবাসরত বাকী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে কিংবা অন্যদেশে তাড়াতে সীমান্তের অভ্যন্তরে নিজেরা নিজেরাই দিনরাত গোলাগুলি ও মর্টারশেল ফায়ারিং করে যাচ্ছে।

পালংখালি ৯ নম্বর ওয়ার্ড আঞ্জুমান পাড়ার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘সোমবার রাত থেকে মিয়ানমারের ঢেকিবনিয়া থানার আওতায় চাকমাকাটা, রাইম্মনখালী, মেদি, কোয়াচিবং, বালুখালী, কুমিরখালী, ডেইবনিয়া সীমান্তবর্তী গ্রামে প্রচণ্ড গোলাগুলি ও মর্টারশেলের বিকট আওয়াজে আমরা এপারে সীমান্তবর্তী মানুষগুলো আতঙ্কে রয়েছি। আমরা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছি। যেতে পারছি না আমাদের চিংড়ি ঘেরে।’

সীমান্ত ঘেঁষা আঞ্জুমান পাড়ার বাসিন্দা গোলজার বেগম (৪৬) বলেন, ‘সূর্য উঠার সঙ্গে সঙ্গে মর্টারশেল ও গুলির শব্দে সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে শিশুদের। গোলার শব্দে কেঁপে ওঠে গ্রামের অনেক কাঁচা বাড়ি। তুমব্রুর পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা থাকায় ধোয়াপালায় পুকুরে যেতেও ভয় হচ্ছে।’  

মঙ্গলবার সকালে বিজিবির পক্ষ থেকে সর্তক করা হয়েছে নিরাপদে থাকার জন্য। সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরত লোকজনদের সরানোর জন্য তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন স্থানীয় মেম্বার।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান হোসাইন সজীব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে উখিয়া সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি শব্দ পাওয়ার বিষয়টি স্থানীয়রা অবহিত করেছেন। ওই সীমান্ত এলাকার ৩০০ মিটারের ভেতরে প্রায় ১০০ পরিবার রয়েছে। আমরা তাদের খোঁজ-খবর রাখছি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

শুন্যরেখায় রোহিঙ্গরা। ছবি: ইত্তেফাক

সম্প্রতি মিয়ানমার থেকে ছোড়া মর্টারশেল ও গোলার আঘাতে শূন্যরেখার এক রোহিঙ্গা নিহতসহ ছয় জন আহত হয়েছেন। এর আগে মর্টারশেল ও গোলার ঘটনায় ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমার রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চারবার তলব করা হয় এবং এসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয় সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু এরপরও গোলাগুলি বন্ধ হয়নি।

ঘুমধুম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘আমাদের অংশ দিয়েও সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি শব্দ পাওয়া গেছে সারাদিন। মাঝে মধ্যে মার্টারশেলের শব্দে এপারের স্থলভূমিও কেঁপে ওঠে। মনে হচ্ছে মর্টারশেলটি সীমান্তের কিনারায় এসে পড়ছে। এমন অবস্থায় সীমান্তের বসবাসকারীরা ভয়ভীতির মধ্য রয়েছেন।’

অপরদিকে, শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা চেয়ে জাতিসংঘের কাছে চিঠি দিয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু জিরো পয়েন্টের অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা মর্টারশেল হামলার নিন্দা জানিয়ে এ প্রতিবাদ সমাবেশ করে। সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে অস্থায়ী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অভ্যন্তরে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের অংশগ্রহণে ব্যানার পেস্টুন নিয়ে মর্টারশেল হামলায় রোহিঙ্গা তরুণ ইকবাল হত্যার প্রতিবাদ জানানো হয়।

এখানকার রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, ‘শুরুর দিকে মিয়ানমার নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) গোলাগুলি-সংঘর্ষ শুরু হলেও এখন তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি) গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করছে। এ অবস্থায় আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে জিরো পয়েন্টের ৬২১টি পরিবারের চার হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে। আমরা গত পাঁচ বছর ধরে এখানে বাস করলেও কারো কোন ক্ষতি করছি না।’

শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গাদের নেতা আব্দুর রহিম বলেন, ‘গত শুক্রবার রাতে শূন্যরেখায় পরিকল্পিতভাবে মর্টারশেল হামলা চালিয়েছে মিয়ানমারের আর্মি। তারা চায় আমরা এখান থেকে সরে যাই, তবে-আমরা অন্য কোথাও যাবো না। যদি যেতেই হয় শূন্যরেখার রোহিঙ্গারা হেটে পাহাড়ের অপর প্রান্তে রাখাইনে নিজেদের ভিটায় ফিরবে।’

উখিয়া সীমান্ত। ছবি: ইত্তেফাক

সমাবেশে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়ে লেখা চিঠি পাঠ করেন শূন্য রেখা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মুখপাত্র দিল মোহাম্মদ।

চিঠি প্রসঙ্গে দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘২০১৭ সালে সামরিক জান্তা আট লাখ রোহিঙ্গাকে তাদের জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে। আমরা চিঠিতে জাতিসংঘকে জানিয়েছি সামরিক জান্তা বাহিনী যেকোনো মুহূর্তে আমাদের ওপর আরও বড় আক্রমণ করতে পারে।’

চিঠিতে এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতিসংঘকে শূন্যরেখার আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ চিঠি জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে প্রেরণ করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন দিল মোহাম্মদ।

প্রসঙ্গত, তিন দফায় মায়ানমার থেকে নিক্ষেপ করা মর্টার শেল পড়ে ঘুমধুম সীমান্তে। সর্বশেষ, এক রোহিঙ্গা নিহত ও ৬ জন আহত হওয়ার ঘটনায় উৎকণ্ঠা বেড়েছে সীমান্ত এলাকায়। তুমব্রু ও উখিয়ার আঞ্জুমান পাড়া, ফারিরবিল এলাকায় সীমান্তের নিকটবর্তী ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ৪০০ পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে প্রশাসন। 

ইত্তেফাক/এএএম