রোববার, ০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

জি এম কাদেরকে রওশনের কড়া ‘আদেশ’, সংকটে জাপা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০৩

রওশন এরশাদকে কেন্দ্র করে জটিল হচ্ছে জাতীয় পার্টির (জাপা) অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রওশন হঠাৎ করেই আগামী ২৬ নভেম্বর দলের কাউন্সিল ডাকায় জাপায় উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তাকে সরিয়ে পার্টি চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা করার জন্য সংসদের স্পিকারকে চিঠি, সেই চিঠির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলায় প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ দলের সকল পদ-পদবি থেকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাকে অব্যাহতি এবং পরবর্তীতে রংপুর জেলা কমিটির সভাপতির পদ থেকেও তাকে সরিয়ে দেওয়া, স্পিকারকে দেওয়া চিঠি প্রত্যাহারের জন্য রাঙ্গার আবেদন- সব মিলিয়ে বহুমুখী সংকট ও নাটকীয়তা বাড়ছে দলটিতে। চলমান উত্তাপের মধ্যেই এবার জিএম কাদেরকে কড়া ‘আদেশ’ করে চিঠি দিয়েছেন রওশন।

জিএম কাদেরকে ‘আদেশ’ করা এই চিঠিতে জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন স্বাক্ষর করেছেন ২০ সেপ্টেম্বর।  দেবর জিএম কাদেরকে সম্বোধন করে লেখা চিঠিতে রওশন বলেছেন, ‘জাতীয় পার্টির সর্বময় ক্ষমতার সংরক্ষক হিসেবে পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ২০ এর উপধারা-১, প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যানের বিশেষ ক্ষমতা এবং মৌলিক অধিকার পরিপন্থি ধারা-২০ এর উপধারা ১ (১)-এর ক. ২ এর ক, খ, গ এবং উপধারা-৩ এ বর্ণিত অগণতান্ত্রিক ও স্বেচ্ছাচারিমূলক বিধান স্থগিত করে জাতীয় পার্টির অব্যাহতিপ্রাপ্ত ও কমিটি থেকে বাদ দেওয়া সকল নেতাকর্মীকে পার্টিতে অন্তর্ভুক্তির আদেশ দেওয়া হচ্ছে।’

যাদেরকে পার্টিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য রওশন এই ‘আদেশ’ দেন, তিনি চিঠিতে তাদের নামও উল্লেখ করেছেন। তারা হলেন- মসিউর রহমান রাঙ্গা, সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা ও আবদুল গাফফার বিশ্বাস; সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খান, এমএ সাত্তার, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর ও কাজী মামুনুর রশিদ, সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন রাজু ও নুরুল ইসলাম নুরু, সাবেক উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম বাচ্চু এবং সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মিলন। তাদের নাম উল্লেখ করে চিঠিতে রওশন বলেছেন, ‘আমার নির্দেশনা অনুযায়ী এদেরসহ দেশজুড়ে অব্যাহতিপ্রাপ্ত, বহিষ্কার ও নিষ্ক্রিয় করে রাখা সকল নেতা-কর্মীকে এই আদেশ জারির পর হতে যার যার আগের পদ-পদবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’

সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও এরশাদপত্নী রওশন তার এই চিঠিতে দলের গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে দেওয়া নিরঙ্কুশ ক্ষমতাকে ‘মৌলিকভাবে গণতন্ত্র ও সংবিধান পরিপন্থি এবং স্বেচ্ছাচারিতামূলক’ বলেও অভিহিত করেন। এবিষয়ে জিএম কাদেরের উদ্দেশে রওশন লিখেছেন, ‘এই ধারা অনুযায়ী আপনি যখন-তখন তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত যে কাউকে দায়িত্ব থেকে বিনা নোটিসে-শোকজে অব্যাহতি ও বহিষ্কার করে একজন রাজনৈতিক কর্মীর গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুন্ন করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। সারা দেশের নেতাকর্মীরা গঠনতন্ত্রে বর্ণিত এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ধারার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এ ধরনের অগণতান্ত্রিক ধারা-উপধারা বাতিল এখন লাখ লাখ পল্লীবন্ধু কর্মী-সমর্থকদের সময়ের দাবি।’

‘আদেশ-নির্দেশ’ সম্বলিত এই চিঠিতে রওশন আগামী ২৬ নভেম্বর তার আহূত দলের দশম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত গঠনতন্ত্রের সব প্রকার ‘অগণতান্ত্রিক ধারা-উপধারা’ স্থগিত ঘোষণা করেছেন। রওশন চিঠিতে আরো লিখেছেন, ‘পার্টির মধ্যে অগণতান্ত্রিক ভাব-আবহ সৃষ্টির কারণে নেতা-কর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে পার্টি খণ্ডিত হওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।’

বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রওশন একটি টেবিলে বসে চিঠিটি পড়ছেন এবং সেটিতে স্বাক্ষর করছেন- গণমাধ্যমের কাছে এমন একাধিক ছবিও পাঠিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসিহ। জিএম কাদেরকে লেখা রওশনের চিঠিটি গতকাল বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো হয় মসিহর স্বাক্ষরে। ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’ আকারে এটি সরবরাহ করেন রওশনপন্থীদের গঠিত মিডিয়া সেলের দায়িত্বে থাকা শেখ রুনা।

চিঠি পাইনি, তিনি আদেশ নয় পরামর্শ দিতে পারেন: জিএম কাদের

রওশনের ‘আদেশ-নির্দেশ’ সম্বলিত চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই ধরনের কোনো চিঠি আমি পাইনি, দেখিওনি।’ আলাপকালে জিএম কাদের বলেন, ‘উনি (রওশন) তো এই ধরনের কোনো আদেশ করতে পারেন না। আমাদের মুরব্বী হিসেবে তিনি পরামর্শ দিতে পারেন। তবে সেই পরামর্শ মানতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।’

রওশন তার চিঠিতে কার্যত জাপার গঠনতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। রওশন ও তার অনুসারীরা অভিযোগ তুলেছেন, দলের সর্বশেষ কাউন্সিলে যে গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছিল সেটিতে ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে রওশনকে কিছু সাংগঠনিক ক্ষমতা দেওয়া ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেই গঠনতন্ত্র পাল্টে ফেলা হয়েছে। এবিষয়ে জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেন, ‘গঠনতন্ত্র গৃহীত হয় কাউন্সিলে, এর আগে সেটি পার্টির প্রেসিডিয়ামে অনুমোদিত হয়। কাউন্সিলে গৃহীত হওয়ার পর সেটি নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। গঠনতন্ত্রে কোনো সংশোধনী আনতে হলে আবার কাউন্সিল ডাকতে হয়, এটাই প্রক্রিয়া। কাজেই এধরনের কথার কোনো ভিত্তি নেই।’

দলের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারাকে রওশনের ‘গণতন্ত্র ও সংবিধান পরিপন্থি এবং স্বেচ্ছাচারিমূলক’ বলে আখ্যায়িত করার জবাবে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘পার্টি কীভাবে চলবে সেটি পার্টির নেতা-কর্মীরা ঠিক করেন। দেশ গণতান্ত্রিক হলেই যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র থাকতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্গানোগ্রামে ও নিয়মে চলে। তেমনি রাজনৈতিক দলসমূহও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেখানে যদি দেশের গণতন্ত্রের সাথে মেলানো হয়, তাহলে তো দলগুলো নিজেদের গঠনতন্ত্রে চলতে পারবে না। তখন দেখা যাবে, প্রত্যেকটি পার্টিকে শুধু কোর্ট-কাচারিতেই ঘুরতে হবে। তাছাড়া প্রতিটি পার্টিতেই দলীয় শৃঙ্খলার স্বার্থে পার্টি-প্রধানকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া থাকে, সেটি দলের কাউন্সিলে কাউন্সিলররা অনুমোদন করে থাকেন। কাজেই, বিষয়টিকে অগণতান্ত্রিক বলা যায় না।’

জিএম কাদেরকে চিঠি পাঠানো হয়েছে: গোলাম মসিহ
রওশনের চিঠি পাননি বলে জাপা চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিষয়ে রওশনের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসিহ ইত্তেফাককে বলেন, ‘ওনাকে চিঠি অফিসিয়ালি পাঠানো হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার অফিস থেকে পাঠানো হয়েছে। ই-মেইলেও হয়তো পাঠানো হয়েছে।’

কাউন্সিলে গৃহীত গঠনতন্ত্র পাল্টে ফেলা হয়েছে: রাঙ্গা
দলের পদ-পদবি খোয়ানো মসিউর রহমান রাঙ্গা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘জাপার বিগত কাউন্সিলে যে গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়েছে সেখানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রওশন এরশাদকে বেশকিছু ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে। তবে পরবর্তীতে কে বা কারা সেই গঠনতন্ত্র পাল্টে ফেলেছেন, যেখানে রওশন এরশাদের কোনো ক্ষমতা রাখা হয়নি। দুটো গঠনতন্ত্রই আমার কাছে রয়েছে; একটিতে রওশনের ক্ষমতা, অন্যটিতে জিএম কাদেরের ক্ষমতা। একটি দলের তো দুটি গঠনতন্ত্র থাকতে পারে না। এভাবে একটি পার্টি চলতে পারে না। এই ঘটনায় দলে সামনে বড় চমক আসছে।’

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন