বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ২১ আশ্বিন ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

মিয়ানমারে বিস্তৃত হচ্ছে গৃহযুদ্ধ, হিমশিম খাচ্ছে সেনাবাহিনী

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:৩২

মিয়ানমারের আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সামরিক বাহিনী বা সরকারের সংঘাতের ইতিহাস পুরোনো হলেও এখন সেটা আরো বিস্তৃত হয়ে উঠেছে। আদিবাসী বা বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে শুরু করেছে গণতন্ত্রপন্থি যোদ্ধারা। সীমান্ত বা দূরবর্তী অঞ্চলগুলোয় একসময় সংঘাতপ্রবণ হলেও এখন সেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলেও।

পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা করছেন, মিয়ানমারে এখন যে অবস্থা চলছে, তাতে অচিরেই দেশটি একটি পুরোদস্তুর গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। মিয়ানমারের এই সংঘাতের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও ভারতেও। বাংলাদেশের ঘুমধুম ও উখিয়া সীমান্ত এলাকায় অব্যাহত গোলাগুলির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সীমান্তের ভেতরে গোলা পড়ায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কয়েক বার সতর্কও করেছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মিয়ানমার থেকে অনেক মানুষ পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

[ছবি: সংগৃহীত]

  • রাজধানীতে কারফিউ

দেশ জুড়ে সংঘাত পরিস্থিতিতে রাজধানী নেপিডো এবং আশপাশের শহরগুলোয় রাতে কারফিউ জারি করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত শহরে চলাফেরা করা যাবে না। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ও বার্তা সংস্থাগুলোর খবর অনুযায়ী, সহিংসতাপ্রবণ এলাকাগুলো ছাড়াও মিয়ানমারের অসংখ্য শহরে কারফিউ এবং মানুষজনের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে সামরিক বাহিনী। মঙ্গলবার তারা নতুন একটি আইন জারি করেছে যে, সামাজিক মাধ্যমে সরকারবিরোধী কোনো পোস্টে লাইক বা শেয়ার করা হলেও কারাদণ্ড দেওয়া হবে।

  • বিদ্রোহীদের বৈঠক, সরকারের রণকৌশল বদল

ইরাওয়ার্দি জানিয়েছে, সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে মিয়ানমারের শীর্ষ সাতটি সশস্ত্র জাতিগত গোষ্ঠীর সদস্যদের গতকাল বুধবার ওয়া রাজ্যের পাংসাংয়ে বৈঠকে বসার কথা। কোভিড মহামারির পর এই প্রথম এসব গোষ্ঠীর নেতারা একত্রে বৈঠকে বসছেন। এসব গোষ্ঠীর প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আরাকান আর্মির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রয়োজনের কারণেই তারা বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন এবং সেখানে মূল লক্ষ্য হবে নিজেদের মধ্যে একতা আরো বৃদ্ধি করা।

[ছবি: সংগৃহীত]

বিবিসির বার্মিজ সার্ভিস জানিয়েছে, এখন উত্তর রাখাইন রাজ্য, চিন রাজ্য, শান ও কাচিন এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে বার্মিজ সেনাবাহিনী। তারা ভারী অস্ত্র ও ট্যাংকের সহায়তায় অনেকগুলো শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। তারা সেখানকার একাধিক গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে এবং গ্রামে গ্রামে অভিযান চালাচ্ছে। বিবিসির বার্মিজ সার্ভিস বলছে, সাধারণ জনগণের ওপর সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্র ব্যবহারের মধ্য দিয়ে সামরিক সরকারের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে সম্প্রতি এই হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার বেশির ভাগ মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মান জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যাই বেশি। ফলে এদের মধ্যে থেকে বিদ্রোহী তত্পরতা শুরু হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে সামরিক সরকারের প্রতি তাদের মনোভাব বদলে যাচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত এলাকা থেকে আরাকান আর্মির কয়েকটি ঘাঁটি তারা দখল করে নিয়েছে। যদিও বিবিসির পক্ষ থেকে এসব তথ্য নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। রাখাইনের মংডু এবং পালেতয়া শহর ঘিরে সড়ক এবং নৌপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। ফলে সেসব এলাকায় খাবার ও জরুরি সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। সামরিক বাহিনীর অভিযানের ফলে মিয়ানমারের লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছে।

[ছবি: সংগৃহীত]

  • যেভাবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইনস্টিটিউট অব পিস। মিয়ানমারের সংঘাতের পুরো ঘটনা নিয়ে তারা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে ব্যাপক সহিংসতার সূত্রপাত হয় ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যখন গণতন্ত্রপন্থি অং সান সু চির সরকারকে উৎখাত করা হয়। কিন্তু দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আর আগের মতো সামরিক শাসনে ফিরে যেতে চায়নি। ফলে তারা সারা দেশ জুড়ে বিক্ষোভ ও আন্দোলন করতে শুরু করে, যেখানে অংশ নিয়েছিল প্রধানত তরুণ গোষ্ঠী আর গণতান্ত্রিক সরকারের কর্মীরা। পরে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষমতাচ্যুত ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)র নির্বাচিত অংশটি।

মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং।

স্থানীয় বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, ক্ষমতাচ্যুত জনপ্রতিনিধি আর জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধিদের একটি সরকার গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় ন্যাশনাল ইউনিটি গর্ভমেন্ট (এনইউজি)। তাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা করেছেন আসিয়ান ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মতপার্থক্য নিরসন করে সরকারবিরোধী আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এনএলডি, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি আর সরকারবিরোধী বিভিন্ন গোষ্ঠী ও জাতিগত গোষ্ঠীগুলো মিলে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে আরেকটা জোট গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় ন্যাশনাল ইউনিটি কনসালটেটিভ কাউন্সিল (এনইউসিসি)। কিন্তু গণতন্ত্রপন্থিদের ওপর যখন সামরিক বাহিনী দমন পীড়ন শুরু করে, তখন তাদের অনেকে দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে সহায়তা ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়। এরপর তারা সারা দেশের গণতন্ত্রপন্থিদের সংগঠিত করে একটি বাহিনী গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ)।

মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় এলাকাগুলোর শহর, নগর আর গ্রামে তারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে, স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ২০২১ সালের অক্টোবর নাগাদ দেশের সব শহর এলাকায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করে পিডিএফ। এই অস্থিরতার সুযোগে মিয়ানমারের আরাকান, কাচিন, কারেন, শান এবং ওয়া বাহিনীর মতো ১১টি জাতিগত গোষ্ঠী, যারা বহু দিন ধরে মিয়ানমারের স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবিতে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তারা নিজেদের আধিপত্য এবং দখল বাড়ানোর জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করে। তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে সামরিক অভিজ্ঞতা লাভ করে পিডিএফের যোদ্ধারাও।

 

ইত্তেফাক/ইআ