বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

পরিত্যক্ত টায়ার থেকে জ্বালানি তৈরি করে তোফাজ্জলের বাজিমাত  

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৪৭

তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে নতুন এক আশার আলো জাগিয়েছেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার এক উদ্যোক্তা যুবক তোফাজ্জল হোসেন। তিনি বাস, ট্রাক, বাইসাইকেল, রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের ফেলে দেওয়া পরিত্যক্ত টায়ার থেকে মূল্যবান জ্বালানি তেল উৎপাদন করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি করেছেন। সেইসঙ্গে সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি তেলের যোগান ও পরিবেশ দূষণকারী যানবাহনের পরিত্যক্ত টায়ার ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। বাড়ছে বিনিয়োগ সম্ভাবনাও। 

এ ব্যাপারে কথা হয় যুবক তোফাজ্জলের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য জোর দিয়েছেন। আসলে চাকরির পেছনে না ছুটে সত্যিকারের একজন উদ্যোক্তা পাল্টিয়ে দিতে পারেন উন্নয়নের আরেক চিত্র। তাই উদ্যোক্তা হয়েছি। 

তোফাজ্জল বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে বিভিন্ন যানবাহনের প্রায় ৫ কোটি টায়ার। পরিত্যক্ত টায়ার থেকে রীতিমতো টায়ার অয়েল অ্যাসফল্ট তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন ভারী শিল্প-কারখানার জ্বালানি হিসেবে টায়ার থেকে তৈরি এই ওয়েল কাজে লাগানো হচ্ছে। এই ওয়েলে সড়ক ও মহাসড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ করা যায়, পাশাপাশি ব্যবহার করা যায় অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে।

টায়ার থেকে তৈরি জ্বালানি বিক্রি হচ্ছে

শুধু জ্বালানি তেলই উৎপন্ন হচ্ছে না, একইসঙ্গে ছাপাখানাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত মূল্যবান কালি কার্ব তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়াও, টায়ার থেকে বের হওয়া তারগুলো চলে যাচ্ছে ফাউন্ড্রি শিল্পে এবং স্টিল রিরোলিং মিলে, সেখানে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান রড। এদিকে, টায়ার থেকে এসব মূল্যবান উপাদান পাওয়ায় এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার পূর্বদলিরামপুর এলাকায় গংগাচড়া সড়কের পাশে তোফাজ্জল বার্নিং ওয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ নামের এই কারখানটি চায়না কারিগরি প্রযুক্তিতে সম্পূর্ণ বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণমুক্তভাবে চলছে। প্রায় এক একর জমির ওপর নির্মিত নতুন এই কারখানায় প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার জ্বালানি তেল উৎপাদিত হচ্ছে। 

উদ্যোক্তা তোফাজ্জলের তথ্য মতে, বাজারে এখন ডিজেল ১১৪ টাকা লিটার। ফার্নেস ওয়েল ৭০ টাকা লিটার। টায়ার থেকে উৎপাদিত তেল তিনি লিটার প্রতি মাত্র ৫৫ টাকা বিক্রি করছেন। সাশ্রয়ে পাওয়া এই জ্বালানি তেলে যেকোনো শিল্প উদ্যোক্তা ব্যাপক লাভবান হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই শিল্পে সরকার সহযোগিতা করলে গোটা দেশ ও জাতি উপকৃত হবে। কারণ প্রতিদিন বিদেশ থেকে ডিজেল ও ফার্নেস ওয়েল আমদানিতে সরকারের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে। তাছাড়া ডিজেল ও ফার্নেস ওয়েলে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশেই যদি টায়ার থেকে তেল উৎপাদনের এই শিল্পকে বিকশিত করা যায়, তাহলে একদিকে যেমন সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে না, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। সেইসঙ্গে সচল হবে দেশের অনেক বন্ধ হয়ে থাকা কারখানা ও শক্তিশালী হবে দুর্বল ভারী শিল্প-কারখানা।

গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মারুফ হোসেন অন্তিক বলেন, আমার এলাকায় ছয় মাস পূর্বে এই কারখানা স্থাপন করেছে যুবক তোফাজ্জল। তার এই কারখানায় এলাকার বেকার ৫০ জন কাজ করছে। এতে ওইসব পরিবারের আয়-রোজগার বৃদ্ধি পেয়েছে।

নীলফামারীর শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার সফিকুল আলম বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোক্তা হওয়ার আহবানের ডাকে সাড়া দিয়ে তোফাজ্জল আজ বদলে ফেলেছে নীলফামারীর উন্নয়নের আরেকটি চিত্র। তাকে আমরা সাধুবাদ জানিয়েছি। টায়ার থেকে তেল এ জেলার শিল্প-কারখানায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। 

জ্বালানি তৈরির কারখানা

নীলফামারীর সৈয়দপুরে রয়েছে শিল্পপতি রাজ কুমার পোদ্দারের মালিকানাধীন নোয়াহ রয়েলেক্স মেটাল ইন্ড্রাস্ট্রি। এখানে  তৈরি হয় প্রেসার কুকার, গ্যাসের চুলা ও তৈজসপত্র। যা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাড়াও বিদেশে পাঠানো হয়ে থাকে। এই শিল্পকারখানার মালিক বলেন, পণ্য উৎপাদন করতে আমদানি করতে হতো ফার্নেস তেল। বিশেষ করে অ্যালুমিনিয়াম পণ্য তৈরিতে ফার্নেস তেল ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু এখন জ্বালানি খরচে সাশ্রয় নিয়ে এসেছে নীলফামারীর উদ্যোক্তা তোফাজ্জল। তার ওখানকার উৎপাদিত টায়ার তেল কম মূল্যে পাচ্ছি আমি। তাই এখন উৎপাদন খরচও কমে এসেছে। 

কিশোরীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মাহমুদুল হাসানের কাছে এই তেল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন সড়কের কাপের্টিং কাজে হপার মেশিনের মাধ্যমে পাথর এবং বিটুমিন গরম করে মিশ্রন করে কার্পেটিং করতে হয়। হপার মেশিনে কার্পেটিংয়ের মালামালের মিশ্রনের সময় জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের প্রয়োজন হতো। সেখানে ডিজেলের পরিবর্তে টায়ার অয়েল কিংবা ফার্নেজ অয়েল ব্যবহার করলে নির্মাণ ব্যয় কম হয়। 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা খুবই সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বটে। কেননা বাতিল হওয়া টায়ারগুলো যদি ধ্বংস করা না হয় তাহলে এগুলো একদিকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। তাই পরিত্যক্ত টায়ার থেকে এই তেল দেশের অর্থনৈতিতে সুফল বয়ে আনাসহ পরিবেশ রক্ষা করবে।

ইত্তেফাক/এইচএম