শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বিনা টিকিটে ভ্রমণ রোধ করতে পারছে না রেল

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৮:০২

বিনা টিকিটে ভ্রমণ রোধ করতে পারছে না রেল। ফলে  প্রতিদিনই বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। লোকাল, মেইল ও আন্তঃনগর ট্রেনের প্রায় অর্ধেক যাত্রীই টিকিট কাটছে না। আর এভাবে বিনা টিকিটে ট্রেন চড়ায় শুধু আন্তঃনগর ১০৫টি ট্রেনেই প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা আয় বঞ্চিত হচ্ছে রেল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ২৫৫টি মেইল ও লোকাল ট্রেনেও নির্ধারিত আসনের এক-চতুর্থাংশ যাত্রী টিকিট কাটে না। অথচ ওসব ট্রেনের নির্ধারিত আসনের তিন থেকে চার গুণ বেশি যাত্রী রেলে ভ্রমণ করে। লোকাল, মেইল ও আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট না কাটায় প্রতিদিন রেলকে গড়ে ২ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সূত্র মতে, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রতিদিন সোয়া দুই লাখ যাত্রী বহন করে। সঙ্গে বিনা টিকিটের যাত্রী হিসাব করলে সংখ্যাটি তিন গুণ হবে। বর্তমানে রেলের টিকিট পরীক্ষকের (টিটিই) সংখ্যা খুবই কম। আন্তঃনগর ট্রেনে মাত্র ২৫ শতাংশ টিটিই কাজ করছে। ১০৫টি ট্রেনের মধ্যে ৪০টিতেও তারা যথাযথভাবে অবস্থান করতে পারছে না। একেকটি ট্রেনে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ জন টিটিই থাকার কথা থাকলেও মাত্র দুই-একজন দায়িত্ব পালন করছে।

অপরদিকে, ২০০৭ সালের ২৯ অক্টোবর সরকার রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা রহিত করে। এরপর থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বন্ধ। ফলে টিকিটবিহীন যাত্রীদের সাজা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। টিকিট পরিদর্শকের  ৭৩ শতাংশ পদ শূন্য থাকায় শতভাগ যাত্রীকে চেকের আওতায় আনা যাচ্ছে না। ৪৮৪টি স্টেশনের মধ্যে মাত্র সাতটিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী আছে। বাকিগুলো উন্মুক্ত। ফলে এসব স্টেশন থেকে বিনা টিকিটের যাত্রীরা বাধাহীনভাবে বেরিয়ে যাচ্ছে।

রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) অসীম কুমার তালুকদার বলেন, আমাদের লোকবল স্বল্পতা অনেক। তাছাড়া ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাও নেই। তারপরও যেসব অভিযান পরিচালনা হয়, সেখানে বিনা টিকিটের কিছু যাত্রীর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলওয়েতে ২৩ হাজার ১৭৮ পদ শূন্য। সারা দেশে ১২৩টি রেলস্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। এসব স্টেশন ও সংলগ্ন জমি বেহাত হওয়ার আশঙ্কা আছে। সড়ক পরিবহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলতে পারছে না রেল।

সব মিলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি বছর বছর বেড়েই চলেছে। এখান থেকে বেরিয়ে এসে রেলকে লাভজনক করতে হলে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনীয় লোকবল ও তাদের ক্ষমতা দিতে হবে বলে তারা মনে করেন।

সূত্র জানায়, রেলে এক টাকা আয় করতে প্রায় ছয় টাকা খরচ হচ্ছে। আর দেশের রেল স্টেশনগুলো যথাযথভাবে তৈরি করা হয়নি। ফলে কোনো স্টেশনেরই শতভাগ নিরাপত্তা নেই। যে কারণে মানুষ খুব সহজেই স্টেশনে প্রবেশ ও বের হতে পারে এবং খুব সহজেই ট্রেনে উঠতে পারে। দেশের প্রধান দুটি রেলস্টেশন কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে যে কেউ খুব সহজেই বিনা টিকিটে ট্রেনে উঠতে পারে। প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রীই উন্মুক্ত স্টেশন দিয়ে অথবা আউটারে নেমে পালিয়ে যায়। গত বছর রেলওয়ে ৫৩টি রেলওয়ে স্টেশন সংস্কারের প্রকল্প নেয়। ইতিমধ্যে ঐ প্রকল্পের প্রায় অর্ধেকের বেশি সংস্কার করা হয়েছে। প্রতিটি স্টেশনের সংস্কার কাজ তদারকি করতে মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে ১০টি কমিটি করা হয়েছে। তবে ওসব কমিটির সদস্যরা যথাযথভাবে সংস্কার কাজ তদারকি করতে পারছে না। ফলে বিভিন্ন স্টেশনে নামেমাত্র কাজ হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, রেলে একটি প্রকল্পের সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশের সবকয়টি স্টেশনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কিন্তু অধিকাংশ উন্নয়ন কাজে রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা হয়নি। বিষয়টি রেলওয়ে বিভাগ ও মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রেনে সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চলমান ট্রেনগুলোর সঙ্গে অতিরিক্ত কোচ লাগিয়েও আয় বাড়ানো যেতে পারে। বিনা টিকিটে যাত্রী ভ্রমণ রোধ এবং নির্ধারিত মোট টিকিটের সঙ্গে ২০-২৫ শতাংশ আসনবিহীন টিকিট বিক্রি করা হলে আয় আরো বাড়ত।

টিকিটধারী যাত্রীদের বড় অংশের বক্তব্য, ট্রেনে টিকিট নেই এমন যাত্রীদের রাজত্ব চলে। তাদের অভিযোগ-নিরীহ যাত্রীদের কাছ থেকে টিটিইরা উৎকোচ নিয়ে ব্যবস্থা করে থাকেন।

ইত্তেফাক/এসএস