শনিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

সার আমদানি

সোনালী ব্যাংকের এলসি বাতিল করেছে সৌদি আরবের দুই ব্যাংক

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২২, ০৩:৫২

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে সার আমদানির লেটার অব ক্রেডিট (ঋণপত্র) বাতিল করেছে সৌদি আরবের দুটি ব্যাংক। ব্যাংক দুটি হলো আল-বিলাদ ও ব্যাংক আল জাজিরা। সোনালী ব্যাংকের চারটি এলসি বাতিল করেছে এই দুই ব্যাংক। পরিস্থিতি সামলাতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) পরে জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে চারটির পরিবর্তে দুটি এলসি খুলেছে।

এই ঘটনায় চলমান ও আগামী বোরো মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া সার সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা করছে বিসিআইসি। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে সার আমদানির এলসিগুলো সৌদি আরবের দুটি ব্যাংক বাতিল করায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়েছে। সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ্ মো. ইমদাদুল চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, সৌদির দুটি ব্যাংক থেকে পরপর চারটি এলসি বাতিলের ঘটনায় আমদানিতে শিডিউল বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। এখনই দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। ডিলারদের অনেকেই বলছেন, মূল্যবৃদ্ধি ছাড়াও সার সংকটের কারণে তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।

জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডলারে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে প্রতি লটে ৩০ হাজার টনের চারটি লটের ইউরিয়া আমদানি পৌঁছানোয় সৌদি আরবের ব্যাংক আল-বিলাদ এবং ব্যাংক আল জাজিরা এলসি বাতিল করে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের ব্যাংকগুলো নির্ধারিত তারিখের আগেই পেমেন্ট চাচ্ছে। এটা দেওয়া হলে আগে থেকেই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হবে। এই অবস্থায় কনফরমেশন প্রুভিং ব্যাংক ফান্ড রেইস করবে, সে জন্য তাদের ইন্টারেস্ট দিতে হবে। কিন্তু গ্রাহক মার্কেট রেটে নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রেটে ডলার চাচ্ছে। যে কারণে এটা নিয়ে দুই পক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে সৌদি আরবের দুই ব্যাংক এলসি বাতিল করেছে।   

এদিকে এলসি বাতিল করার ঘোষণায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় থেকেও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।  অবশ্য বিসিআইসি সূত্র বলছে, সারের সরবরাহ এই মুহূর্তে স্বাভাবিক করতে না পারলে চলমান  পিক সিজন এবং আসন্ন বোরো মৌসুম ইউরিয়া সারের স্বাভাবিক সরবরাহ ধরে রাখা সম্ভব হবে না।

জানা গেছে, সৌদি আরব থেকে প্রতিটি ৩০ হাজার টনের মোট ১৬টি লটে জিটুজি প্রক্রিয়ায় সার আমদানি করছে বাংলাদেশ সরকার। এর প্রথম তিনটি লটের চালান আনলেও পরবর্তী চার লটের সার আমদানিতে বিপত্তি বাধে। এর মধ্যে চার ও পাঁচ নম্বর লটের সার নেওয়ার জন্য বন্দরে সাত দিন ধরে জাহাজ লোডিংয়ের জন্য রেডি করা ছিল। যে কারণে এই জাহাজে ডেমারেজ হিসেবে প্রতিদিন ২০ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হয়েছে সরকারকে। 

বিসিআইসির চেয়ারম্যান শাহ্ মো. ইমদাদুল হক গভর্নরকে পাঠানো চিঠিতে সার সরবরাহে সংকটের পরিস্থিতি তুলে ধরে জানান, অক্টোবর মাসেই ২ লাখ ৪০ হাজার টন সার আমদানির শিডিউল নির্ধারিত রয়েছে। এর সঙ্গে আপত্কালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্যও আরো ১ লাখ ৮০ হাজার টন সার আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।

চিঠিতে তিনি আরো লিখেছেন, সেপ্টেম্বর মাসে এলসি স্থাপনে যে জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, আগামীতে এলসি স্থাপনে এই সংকট বিদ্যমান থাকলে পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সার সংগ্রহ মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

তবে এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আফজাল করিম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘বিসিআইসি সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে সার আমদানি করার জন্য এলসি করে থাকে। গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে আমরা ৩৩ মিলিয়ন ডলার পেমেন্ট করেছি। এখন বিষয়টি হলো সৌদির রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ‘সৌদি বেসিক কোম্পানি’ থেকে বিসিআইসি প্রথমে সার আমদানি করবে। সৌদি আরবের ব্যাংক আল-বিলাদ প্রথমে একটি এলসি খোলে। পরে তাদের অনুরোধে আল-বিলাদকে পরিবর্তন করে এলসি দেওয়া হয় ব্যাংক আল জাজিরাকে। ব্যাংক আল জাজিরার সঙ্গে ঐ প্রতিষ্ঠানের (সৌদি বেসিক কোম্পানি) পলিসিগত কারণে এটি এক্সিকিউট করতে পারেনি। পরে জানা গেছে, পলিসিগত কারণটি হলো সৌদি বেসিক কোম্পানির যে ক্রেডিট লিমিট ছিল সেটি সে সময়ে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।  যে কারণে তারা তখন তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।  পরে  ব্যাংক আল জাজিরার সঙ্গে আমরা গত সপ্তাহে এলসি করেছি যা গৃহীত হয়েছে। সুতরাং এখানে সোনালী ব্যাংকের কোনো সমস্যা নেই। লোকাল রপ্তানিকারকের সঙ্গে তাদের ব্যাংকের যে অ্যারেজমেন্ট ছিল পলিসিগত কারণে এটি তারা তখন বাস্তবায়ন করতে পারেনি।’ সোনালী ব্যাংকের ডলারের কোনো সমস্যা নেই বলেও জানান তিনি।               

বিসিআইসি তথ্য বলছে, চলতি বছরে ইউরিয়ার চাহিদা রয়েছে ২৬ লাখ মেট্রিক টন এবং নিরাপত্তা মজুত হিসেবে ৮ লাখ টন মিলিয়ে মোট ৩৪ লাখ টন। বিসিআইসির তথ্য অনুযায়ী সংস্থাটির চারটি নিজস্ব সার কারখানার মাধ্যমে ১০ দশমিক ৫০ লাখ টন উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে গ্যাস-সংকটের কারণে তিন মাসের বেশি সময় ধরে যমুনা সারকারখানা একেবারেই বন্ধ রয়েছে। গ্যাস-সংকট ও অব্যাহত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাকি তিনটিরও উত্পাদন সুবিধাজনক পর্যায়ে নেই। যে কারণে ৫ লাখ টন ইউরিয়া অতিরিক্ত আমদানির অনুমোদন নিয়েছে বিসিআইসি। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী বিসিআইসির আমদানি লক্ষ্য ছিল ১৭ দশমিক ৭০ লাখ টনের। এর মধ্যে ১১ দশমিক ৭০ লাখ টনই আমদানি করার কথা সৌদি আরব থেকে। এর বাইরে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড বা কাফকোর কাছ থেকে ৬ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। বাড়তি ৫ লাখ টন ইউরিয়াও আমদানি করা হবে সৌদি ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে।

 

ইত্তেফাক/ইআ