বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইত্তেফাকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে আইজিপি

‘থানায় মানুষের সেবাপ্রাপ্তি ও পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিত করব’

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০১:০৩

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেছেন, দেশের সবগুলো থানায় জনগণের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। মানুষের সেবাপ্রাপ্তির প্রথম ভরসাস্থল হবে থানা। তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করতে হবে। মানুষের কথা শুনে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রেঞ্জের ডিআইজি, জেলার এসপি ও অতিরিক্ত এসপি সংশ্লিষ্ট থানায় নিয়মিত মনিটরিং করে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। ইতিমধ্যে পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। 

গতকাল বুধবার ইত্তেফাকের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাত্কারে আইজিপি এসব কথা বলেন। দীর্ঘদিন ধরে থানা পুলিশের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে। থানায় গেলেই হয়রানির শিকার হতে হয় জনগণকে। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এই অবস্থার অবসান চান নতুন আইজিপি। 

বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন।

গত শুক্রবার আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই তিনি থানাগুলোকে জনগণের সেবাপ্রাপ্তির ভরসাস্থল হিসেবে গড়ে তেলার উদ্যোগ নেন। পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে জনগণের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিতে মাঠ কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

আইজিপি বলেন, মানুষ পুলিশের সেবা পেতে প্রথম থানায় আসে। থানার দরজা কখনো বন্ধ হয় না।

বাংলাদেশ পুলিশের এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে আপনি মনে করেন? এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনি কী পদক্ষেপ নিবেন?

এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের বহুমুখী কার্যক্রম সব সময়ই চলে থাকে। আমরা দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আসছি। মাদক, জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ, সাইবার ক্রাইম, ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম, সোশ্যাল মিডিয়া প্রোপাগান্ডা—ইত্যাদি অপরাধ আমরা সফলতার সঙ্গে দমন করে আসছি। পুলিশের সেবা প্রদানের মূল কেন্দ্র থানার জনমুখী কার্যক্রমের ফলে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা অনেকাংশে বেড়েছে। পুলিশের সেবাকে আরো জনমুখী করার জন্য আমরা বিট পুলিশিং, কমিউনিটি পুলিশিং, ওপেন হাউজ-ডে ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা বাড়িয়েছি।

থানায় নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের সহজে সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বিশেষ ডেস্ক স্থাপন করা হয়েছে। আমরা এসব কার্যক্রমকে আরো জোরদার করব। দেশের সম্মানিত নাগরিকগণ যাতে সহজে, নির্ভয়ে থানায় আসতে পারেন, তাদের সমস্যার কথা বলতে পারেন এবং সেবা গ্রহণ করতে পারেন সে ব্যাপারে আমি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছি। যারা একেবারে সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, নিরীহ, নির্যাতিত, গরিব, অসহায় তাদেরকে থানা এখন অনেক আন্তরিকভাবে সেবা প্রদান করছে। জনগণের দোরগোড়ায় এই সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা আরো আন্তরিক ও সচেষ্ট হব।

আইজিপি হিসেবে আপনি কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেবেন? 

এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, আমি আগেও বলেছি, পুলিশের কার্যক্রমের কেন্দ্রমূল হচ্ছে থানা। তাই থানার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আমি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছি। জনগণের সেবাপ্রাপ্তি সহজ করার লক্ষ্যে উদ্ভাবনী কার্যক্রম ও উত্তম চর্চা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে।

সামনে জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচনকে ঘিরে এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশের আচরণে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে। এক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা কী হবে?

এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবাধ, সুষ্ঠু, সংঘাতমুক্ত ও অনুকূল পরিবেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সম্পাদনের লক্ষ্যে আমাদের অপারেশনাল সক্ষমতা, জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, ইন্টেলিজেন্স ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করেছি। আপনারা জানেন, পুলিশ নির্বাচন কমিশনের অধীনে থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করে থাকে।

জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি নতুন কোন কার্যক্রম গ্রহণ করবেন? 

এমন প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, আপনারা জানেন, জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের সাফল্য ইতিমধ্যে দেশে-বিদেশে প্রসংশিত হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। জঙ্গিবাদের প্রচার ও প্রসার রোধে আমরা সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে কামিউনিটি পুলিশিং- এর মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছি। এক্ষেত্রে আমরা সুশীল সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একযোগে কাজ করছি। আমরা অনলাইন রেডিক্যালাইজেশন ক্যাম্পেইন রোধে সাইবার স্পেস মনিটরিং ও প্রেট্রোলিং জোরদার করেছি। ইন্টেলিজেন্স কার্যক্রম জোরদার করছি। প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন- আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বিগ ডাটা ইত্যাদির কলেবর বৃদ্ধি করেছি। টেরর ফিন্যান্সিং রোধকল্পে আমরা নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছি। 

পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রায়ই দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠে। এক্ষেত্রে আপনার পদক্ষেপ কী হবে? পুলিশকে জনগণের বন্ধু বলা হয়। কিন্তু এখনো বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানুষ পুলিশের কাছে যেতে ভয় পায়। পুলিশকে জনবান্ধব করতে আপনি কী পদক্ষেপ নেবেন? পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব নিয়ে নানা মহল থেকে প্রায়ই প্রশ্ন উঠে। বাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে এক্ষেত্রে আপনার অভিমত কী? 

জবাবে চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, আমরা আগেও বলেছি, আবারও বলছি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলা পুলিশের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। এক্ষেত্রে পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে আপনি কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন? 

জবাবে আইজিপি বলেন, বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব সূচনা করেছেন। দেশের তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আজ ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। এটি আমাদের দেশের জন্য একটি বড় অর্জন। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। এছাড়াও আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের মাধ্যমে সাইবার স্পেস মনিটরিং ও পেট্রোলিং জোরদার করছি। আমরা ইন্টেলিজেন্স কার্যক্রমকে আরো বেগবান করছি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাইবার অপরাধ দমনের জন্য আমরাও আপডেট হচ্ছি।

পুলিশ বাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে পুলিশ সদস্যদের প্রতি আপনি কী বার্তা দিবেন? 

জবাবে আইজিপি বলেন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সেবার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত ‘জনগণের পুলিশ’ প্রতিষ্ঠাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এটি বাস্তবায়নে বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে আমরা আন্তরিক ও নিরলসভাবে কাজ করে যাব।

ইত্তেফাক/এএইচপি