ঈশ্বরদীতে অবস্থিত বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) সাফল্যের সঙ্গে এ পর্যন্ত আখের ৪৮ জাত উদ্ভাবন করেছে। প্রাচীনতম এ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আখসহ মিষ্টি জাতীয় ফসলের উৎপাদন কলাকৌশল উদ্ভাবন ও বহুমুখী ব্যবহারের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। আখের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, দেশের মিষ্টিজাতীয় খাদ্যের উৎস চিনি ও গুড় তৈরির শিল্প। প্রতিষ্ঠানটি আখের পাশাপাশি সুগারবিট, তাল, খেজুর, গোলপাতা, মধু ও স্টিভিয়া প্রভৃতি মিষ্টি জাতীয় ফসলের ওপর গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। দেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বিএসআরআই।
১৯৩১ সালে ঢাকার মনিপুরি পাড়ায় এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। পরে পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৯৫১ সালে বিএসআরআই’র প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়। স্বায়ত্বশাসিত এ প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ৪৮টি আখ (ইু) জাত উদ্ভাবন করেছে। এরমধ্যে তিনটি চিবিয়ে খাওয়া সুস্বাদু আখের জাত রয়েছে।
বিএসআরআই সূত্রে জানা যায়, দেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে বিএসআরআই সারাদেশে ৩টি আঞ্চলিক কেন্দ্র ও ৯ টি উপকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ৮৩ জন বিজ্ঞানী, ৩৯৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ১১৬ জন শ্রমিক কর্মরত রয়েছে। চিনিকল এলাকার ৯৯% ও চিনিকল বহির্ভূত এলাকায় ৬৫% হিসাবে এক লাখ হেক্টর জমিতে আখের জাতগুলো চাষ করা হচ্ছে। আখ ছাড়াও সুগারবিটের দু’টি জাত, একটি বারোমাসি তালের জাত ও একটি স্টেভিয়ার জাত এ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন করেছে। পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিস্তার শ্রেণীতে বিএসআরআই ১,৪২০ বঙ্গবন্ধু কৃষি পদক লাভ করে। এছাড়াও এ প্রতিষ্ঠান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৯৫ হাজার ৫শ’ খেজুর গাছ, ৮৮ হাজার তালের চারা রাস্তা ও নদীর বাঁধের ধারে রোপণ করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৫ হাজার ১শ টি প্রদর্শনী ও গবেষণা প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও আখ চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২,১৫০ জন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং ১৭ হাজার ১শ’ ৬০ জন চাষিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
খামার ইনচার্জ সঞ্জিত মন্ডল জানান, বিএসআরআই ২৩৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এরমধ্যে চাষাবাদযোগ্য জমি ১৫৮ একর। গবেষণা ও খামার বিভাগ এ জমিতে আখ, তাল, স্টিভিয়া, সুগারবিট, তাল, খেজুরসহ বিভিন্ন মিষ্টিজাতীয় ফসলের চাষ ও গবেষণা করে থাকে। বিশেষ করে আখের জাত ঈশ্বরদী-৩৪, ঈশ্বরদী-৩৭, বিএসআরআই-৪১ থেকে বিএসআরআই ৪৬ পর্যন্ত জাতগুলো এখানে সর্বোচ্চ পরিমাণে চাষবাদ করে বীজ উৎপাদন করা হয়। এখানকার উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন ও উন্নত বীজ দেশের বিভিন্ন স্থানের কৃষকদের মধ্যে সরবরাহ করা হয়।
তাল কর্মসূচির পরিচালক সাইয়ুম হোসেন জানান, প্রতিষ্ঠানটি আখের পাশাপাশি অন্যান্য মিষ্টিজাতীয় ফসলের ওপর গবেষণা করে যাচ্ছে। এরমধ্যে তাল অন্যতম। ২০১৭ বিএসআরআই তাল-১ নামে একটি জাতের নিবন্ধন করেছি। এ জাতের ১ লাখ ২০ হাজার চারা উৎপাদন করেছে। শেখ রাসেল দিবস উপলে দেশের বিভিন্ন ইউনিয়নে বিতরণ করা হয়। এবছর ১ লাখ ৫০ হাজার চারা উৎপাদন করা হয়েছে। তালের রস দিয়ে গুড় ও তাল মিশ্রি তৈরি করা হয়। তালের চারা উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
মৌমাছি ও মধু কর্মসূচির পরিচালক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এলমুর রেজা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে এখানে মৌমাছি ও মধু গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দু’জাতের মৌমাছি নিয়ে এখানে গবেষণা করা হয়। এপ্রিস মেলিফেরা ও এপ্রিস সেরেনা। প্লাস্টিক ও কাঠের বাক্সে এ মৌমাছিগুলোর গবেষণা চলমান রয়েছে। এ মৌমাছি যেন সহজে খাবার সংগ্রহ করতে পারে সেজন্য শত শত ফুলের গাছ ও শাপলা লেক করা হয়েছে। শাপলা ও পদ্ম ফুল থেকে মৌমাছি মধু সংগ্রহ করে। এখানকার মৌমাছি চাষ নিয়ে গবেষণা চলমান রয়েছে। উদ্ভাবিত মৌমাছি চাষের পদ্ধতি সাধারণ মৌমাছি চাষিদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে অতি সহজে মধু উৎপাদন করতে পারবে।
বিএসআরআই এর মহাপরিচালক ড. আমজাদ হোসেন জানান, চিনি শিল্পের উন্নয়নে এ প্রতিষ্ঠান নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। আখের ৪৮টি জাত এ পর্যন্ত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এরমধ্যে সর্বশেষ জাত বিএসআরআই-৪৮। এ জাতের সর্বোচ্চ চিনি ধারণের মতা শতকরা ১৫ ভাগ। এই জাত সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হলে চিনি শিল্পে ব্যাপক উন্নয়নের সম্ভাবনা রয়েছে। আখের পাশাপাশি তাল, গোলপাতা, যষ্টিমধু, খেজুর, স্টিভিয়া, মধু, সুগারবিটসহ মিষ্টিজাতের ফসল নিয়ে গবেষণা চালিয়ে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজ করছে। আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রতিবছরই লাখ লাখ তালের চারা উৎপাদন করে দেশজুড়ে বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়াও আখের সাথে সাথী ফসল ফলন উৎপাদনের মাধ্যমে আখ চাষকে আরও লাভজনক করেছে বিএসআরআই। আখের সাথে একই জমিতে বোরো ধান, আলু, সরিষা, মসুর, পিয়াজ, রসুন, ছোলা, গমসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকদের লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি জমির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সাথী ফসল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানান তিনি।
