দেশে মানসিক ব্যাধির ব্যাপকতা বাড়ছে। নানা কারণেই এই মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সমাজের অসঙ্গতি, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, গৃহহীনতা পারিবারিক সমস্যা, দাম্পত্য কলহ, প্রেমে ব্যর্থতা, প্রতারণা—এ ধরনের অসংখ্য কারণে তৈরি হয় বিষণ্নতা, সেখান থেকে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে। এভাবে নানা সমস্যা মোকাবিলা করতে গিয়ে অনেকে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন, কেউবা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন। কেউবা ঘরবন্দি জীবনযাপন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা ও আত্মত্যার চেষ্টাকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। অধিকাংশ আত্মহত্যার সঙ্গে মানসিক অসুখের সম্পর্ক থাকে। অথচ দেশের আইনে আত্মহত্যাকে এখনো একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রতিবেশীসহ অনেক দেশে এটিকে একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আত্মহত্যায় যারা মারা যান, তাদের প্রায় অর্ধেকের মধ্যে বিষণ্ণতা থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে আগামীকাল ১০ অক্টোবর পালিত হবে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে কেউ না কেউ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারান। অথচ আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য। অধিকাংশ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকেন। সাধারণত সেটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না বা মানসিক রোগ নিশ্চিত হলেও যথাযথ চিকিৎসা করা হয় না বলেই আত্মহত্যা বেড়ে যাচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মহত্যার এ হার কমিয়ে আনা সম্ভব।
দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির চিত্র দেখা যায় সম্প্রতি একটি গবেষণায়। চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহননের পথ বেছে নেয়। যাদের মধ্যে ১৯৪ জনই ছিলেন স্কুলগামী শিক্ষার্থী। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন কলেজ শিক্ষার্থীরা; যার সংখ্যা ৭৬ জন। অপর দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহননকারীর সংখ্যা ৫০ জন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশন এই তথ্য প্রকাশ করে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে কম বয়সি স্কুলগামী থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে এই প্রবণতা বেশি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্কুলগামী আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ৬০ শতাংশেরও বেশি। এই হার এত উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কোন কারণগুলো আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় সে বিষয়ে সমন্বিত কাজ করা প্রয়োজন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সামিরা আক্তার সিয়াম বলেন, পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করা, সমাজের প্রতি দায়িত্ববান হওয়া এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্ব দিলে সমাজ থেকে আত্মহত্যা প্রবণতা কমিয়ে আনা যাবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট মেন্টাল হেলথ (বিএসিএএমএইচ) সভাপতি ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলালউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে মানসিক ব্যাধির ব্যাপকতা বেশি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আক্রান্তরা এ রোগে চিকিৎসা পান না বললেই চলে। সরকারি সুপরিকল্পিত নীতিমালার অভাব, অপর্যাপ্ত অর্থবরাদ্দ ও কুসংস্কারজনিত কারণে মানসিক রোগের সুচিকিত্সা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এ রোগের ব্যাপকতা বাড়ছে।
