‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য ছাড়া স্বাস্থ্যের ধারণা অসম্পূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোভিড মহামারীর পূর্বেই ২০১১ সালের জরীপ অনুযায়ী সারা বিশ্বে প্রতি ৮ জন ব্যক্তির মধ্যে ১ জন ব্যক্তি মানসিক ব্যাধি নিয়ে দিনাতিপাত করছিলো। অন্যদিকে, মানসিক স্বাস্থ্য সেবায় দক্ষতা ও বিনিয়োগ দেশে দেশে খুবই অপ্রতুল, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ২০১৯ সনের এপ্রিল থেকে জুন মাসে দেশব্যাপী পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক জরীপে দেখা যায়, দেশের প্রাপ্ত বয়স্কদের (১৮-১৯ বছর) মধ্যে বিভিন্ন ধরণের মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হার মোট জনসমষ্টির ১৬. ৮ শতাংশ যা শিশুদের (৭-১৭ বছর বয়সী) ক্ষেত্রে ১৩.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, এদেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি অধিবাসী কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাগত চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন। অথচ এই ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে মানসিক চিকিৎসক, চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী মিলে মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর সংখ্যা সারা দেশে মাত্র ৩০০ জনের মত যার মধ্যে ২০০ জনের অধিক ঢাকায় বসবাসরত।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের ঐ রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রায় ৯৪, ৫% মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এই পরিসংখ্যান অবশ্যই আতঙ্কজনক, কারণ এই বিশাল জনসমষ্টিকে বাদ দিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। আবার, সুচিকিৎসা পাওয়াটাও রাষ্ট্রের নাগরিক চাহিদা।
তবে, আশার কথা এই যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশের মহান সংসদে মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ পাশ হয়। এর আলোকে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, করোনা মহামারীর সময় সারা বিশ্বব্যপী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের আরও ভয়াবহ অবনতি হয়েছে। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, করোনার প্রথম বছরেই বিশ্বে উদ্বেগ ও বিষণ্ণতার হার ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং করোনা পরবর্তী স্বল্পস্থায়ী ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ লাখো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের হানি ঘটিয়েছে। যা আমাদের বিদ্যমান নাজুক মানসিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরো চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
করোনার সাথে যুক্ত হয়েছে মানবসৃষ্ট দুর্যোগসমূহ যেমন, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাধ্যতামূলক দেশান্তর, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি। কেবল ২০২১ সালেই সারা বিশ্বে প্রায় ৮৪ মিলিয়ন মানুষকে নিজের দেশ ও বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা স্বপ্ন দেখি মানসিক স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন, উন্নয়ন ও সুরক্ষা, যা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের অংশ। তাই এ বছরের আন্তর্জাতিক মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য, "সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ভালো থাকাই হোক বৈশ্বিক অগ্রাধিকার" -এর সাথে ঐক্যমত্য ঘোষণা করে আমরা ব্যক্তি, সমাজ, সরকার, পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবীসহ সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বয়সের এবং সকল ধরণের মানসিক রোগীকে চিকিৎসা সেবার আওতায় নিয়ে আসতে চাই। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বয় ও সদিচ্ছা।
শুধু মানসিক রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিই নয় বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মানসিক স্বাস্থ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ একটি সমীক্ষায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন পাউন্ড বাঁচানো সম্ভব শুধু কাজ ছেড়ে দেয়া এবং কাজে অনুপস্থিতির হার কমিয়ে, যা কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে সরাসরি জড়িত। ঐ জরীপে আরও দেখা যায়, যদি ৫০০ জন কর্মীর একটি প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ৪০ হাজার পাউন্ড বিনিয়োগ করা হয়, তবে ৩, ৪৭, ৭২২ পাউন্ড মুনাফা করা সম্ভব। বাংলাদেশেও ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প ক্ষেত্রে কর্মরত বিশাল কর্মীবাহিনী বা জনশক্তির জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে তা অভাবনীয় সাফল্য এনে দেবে।
ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ' বিগত ২০১৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১০ই অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করে আসছে । সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট ড. নাসের লোজা বলেন, ২০২১ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব বলেছেন, করোনা মহামারী দ্বারা সৃষ্ট মানসিক সমস্যাগুলোর ব্যাপারে যদি আমরা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে না পারি তবে তা হবে করোনা মহামারীর চেয়েও ভয়ঙ্কর। তাঁর মতে, বর্তমানে উন্নত বিশ্বে ৭৫% বিষণ্ণতার রোগী যথেষ্ট ভালো চিকিৎসা পাচ্ছেন না এবং অনুন্নত বিশ্বে ৭৫% মানসিক রোগী কোনো প্রকার চিকিৎসাই পাচ্ছেন না। উক্ত সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেল প্রফেসর গ্যাব্রিয়েল ইভিজারো বলেন, প্রতিটি ব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে আমাদের সোচ্চার কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হতে হবে, যাতে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র সকলের মধ্যে ব্যাপক জন সচেতনতা সৃষ্টি হয়।
২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে গৃহীত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ আমরা অর্জন করতে পারবো না, যদি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা খাতে আমরা পর্যাপ্ত পরিমাণ বিনিয়োগ করতে না পারি। তাই, বৈশ্বিক মানসিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণ অর্জনের জন্য এমন কিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যা হবে ব্যক্তি ও সমাজকেন্দ্রিক যেমন সবার জন্য ফিকামলি অনুশীলন, সুষম খাদ্যের গ্রহণ ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, সুস্থ বিনোদন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, সঠিক ধর্মীয় অনুশাসন ।
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, শিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞান গবেষক, প্রধান পৃষ্ঠপোষক বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতি।
