শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গভীর সংকটে শিল্প খাত

দ্রুত পড়ে যাবে রপ্তানি আয়

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২২, ০৫:০৪

কঠিন সময় অতিক্রম করছে দেশের শিল্প খাত। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কারণে উদ্যোক্তাদের এখন গলদঘর্ম অবস্থা। বিদ্যুৎ ও গ্যাসসংকটের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে মূল্যবান জ্বালানি দিয়ে জেনারেটর চালিয়ে উত্পাদন ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এর ফলে পণ্যের উত্পাদনখরচ বাড়ছে। আবার বাংলাদেশ যেসব দেশে পণ্য রপ্তানি করে সেসব দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি আদেশ কমছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারা কৃচ্ছ সাধন করছে। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো সংকটের মধ্যে পড়েছে। বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, জ্বালনিসংকটের কারণে কারখানার উত্পাদন ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ বন্ধ আছে। এর ফলে ব্যাংকঋণ পরিশোধে তাদের ওপর চাপ বাড়বে। অনেকে ঋণখেলাপি হয়ে পড়বেন। উত্পাদন বন্ধ থাকায় তা কর্মসংস্থানের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানার চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানকার কারখানাগুলোতে দিনে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। অনেকে জেনারেটর চালিয়ে উত্পাদন ঠিক রাখার চেষ্টা করছেন। বড় কারখানাগুলোয় দৈনিক গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার ডিজেল ব্যবহূত হচ্ছে। অনেক আগে থেকেই গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলো গ্যাসসংকটে ভুগছিল। টেক্সটাইল, সিরামিকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জ্বালানি গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। গ্যাস-সংকটের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিদ্যুত্সংকট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু দিনদিন পরিস্থিতির অবনতিতে উদ্বেগ বাড়ছে উদ্যোক্তাদের।

অভ্যন্তরীণ সংকট: উদ্বিগ্ন কারখানা মালিকরা

কারখানায় বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই—এ যেন এক দুঃসহ অবস্থা। বিদ্যুতের ঘনঘন আসা-যাওয়ায় অনেক কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানির অভাবে গ্যাস জেনারেটরও চালানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে উদ্যোক্তাদের ডিজেলচালিত জেনারেটরের দিকে যেতে হচ্ছে। শুধু দেশীয় নয়, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ বা ইপিজেডের কারখানাগুলোরও একই অবস্থা। ঢাকা ইপিজেডের উদ্যোক্তা জসিম আহমেদ ইত্তেফাককে জানান, তিনি বিভিন্ন রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য এক্সেসরিজ উত্পাদন করেন। তিনি জানান, ইপিজেডে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হয়। এখন এসব কেন্দ্র দিনে দুই থেকে তিন বার ট্রিপ করে। যার ফলে উত্পাদন ঠিক রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন প্রকার কাপড় ডায়িং করে শেষ করা যায় না।

তিনি জানান, উত্পাদন কম হলেও উদ্যোক্তাদের অন্যান্য খরচ ঠিকই আছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে হলে উত্পাদন কমিয়ে আনার বিকল্প নেই। এত করে কর্মসংস্থান কমবে। তৈরি পোশাক খাতের বড় উদ্যোক্তা হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, দেশের স্পিনিং মিলগুলো বিরাট সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব কারখানা আমরা তেলচালিত জেনারেটর দিয়েও চালিয়ে রাখতে পারছি না।

তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছেন, স্পিনিং মিলগুলোর উত্পাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম হচ্ছে। জ্বালানিসংকটের কারণে এসব কারখানা পুরোপুরি চালানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, বিভিন্ন কারখানায় হিসাব নিয়ে দেখা গেছে, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। এটি আশু সমাধানের কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের কারখানা সমস্যায় পড়তে যাচ্ছে। এর ফলে রপ্তানিতে ঘাটতি হবে।  ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

এদিকে, কারখানায় উত্পাদন কমে যাওয়ার কারণে অনেক কারখানা শ্রমিক ছাঁটাই করা শুরু করেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এখন কারখানাকে বাঁচিয়ে রাখাই দায় হয়ে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক সংকট: উদ্যোক্তাদের ঘুম হারাম

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় অংশ আসে রপ্তানি খাত থেকে। বিশেষ করে এ খাতে মোট আয়ের ৬০ শতাংশের ওপরে আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোতে যায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক। কিন্তু করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশগুলোতে অর্থনৈতিক মন্দার বাতাস লেগেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, আগের অর্ডার করা পোশাকগুলো তারা নিচ্ছেন না। অনেকে নতুন অর্ডার দিচ্ছেন না। বেশ কয়েকটি কারখানার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্ডার করা পোশাক ডেলিভারি না নেওয়ার ফলে কারখানাগুলোর গোডাউনে পোশাকের স্তূপ পড়ে গেছে। অনেকে সিঁড়িতেও পোশাক রাখছেন। গ্লোবাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম আহমেদ বলেন, আমদানিকারক দেশগুলো ইতিমধ্যে মন্দার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। স্টোরগুলো খালি হচ্ছে না। চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নতুন অর্ডার নেই। অনেকে দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। অপর দিকে জ্বালানিসংকটে উদ্যোক্তদের উত্পাদন খরচ বেড়েছে। হা-মীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্র মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেখানকার ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিচ্ছেন না। আগের দেওয়া অর্ডারের পণ্যও নিচ্ছে না। আমাদের কারখানাগুলো উত্পাদিত পণ্যে ভর্তি হয়ে গেছে। আপাতত আগামী এপ্রিল পর্যন্ত এ অবস্থা চলবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।

রপ্তানি বাজারের অবস্থা কী

বাংলাদেশ যেসব দেশে পণ্য রপ্তানি করে সেসব দেশের অবস্থা কেমন তা জানতে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা ঐসব দেশ সফর করছেন। এসব সফরে তারা নতুন ক্রেতা খোঁজার পাশাপাশি পুরোনোদের অবস্থারও খোঁজ নিচ্ছেন। জার্মানির ফ্রাংকফুর্ট থেকে বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এবং পোশাক খাতের বড় উদ্যোক্তা এ বি এম সামছুদ্দিনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, নামিদামি ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতে এখনো ভিড় আছে। কিন্তু সাধারণ ব্র্যান্ডের দোকানগুলো একেবারেই খালি।

সাধারণ চোখে বোঝা যায়, যাদের হাতে অর্থ আছে তারা কেনাকাটা করছে। এদের সবাই উচ্চবিত্ত। জার্মানি, ফ্রান্স, মালটা, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশ সফর করে তিনি এ চিত্র দেখেছেন বলে জানান। তবে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অর্ডার থাকুক আর না-ই থাকুক ক্রেতারা পথে বসবেন বলে তিনি জানান।   

ইত্তেফাক/জেডএইচডি