বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির দুই দিনব্যাপী সম্মেলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটোরিয়ামে উদ্বোধন করা হয়েছে। শুক্রবার (১৪ অক্টোবর) সকাল ১০ টায় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. আক্তারুজ্জামান। বিকেলে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।
অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি ফিকামলি তত্ত্বের জনক, মনোবিজ্ঞান গবেষক, বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক ড. আব্দুল ওয়াদুদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘আজকের মনোবিজ্ঞান সমিতির এই বিশাল আয়োজনের প্রেক্ষাপট বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশে মনোবিজ্ঞান তথা মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য মনোবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু বেড়ে গেছে। শহরের ব্যস্ততম জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে আমরা নানাভাবে ব্যস্ত থাকি, সেটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড-যেটাই হোক না কেন, পুরোটাই আমরা ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে বেড়াই। ফলে ব্যক্তি, পরিবার এবং সমাজে সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য যে পরিবেশ থাকা প্রয়োজন বা যে ধরনের প্রায়োগিক এবং গুণগত মানসিক শিক্ষা থাকা প্রয়োজন, তার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কারিগরি সহায়তায় বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন অবধি দেশব্যাপী পরিচালিত এক বৈজ্ঞানিক জরিপে দেখা যায়, দেশের প্রাপ্তবয়স্কদের (১৮-১৯ বছর) মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হার মোট জনসমষ্টির ১৬. ৮%, যা শিশুদের (৭-১৭ বছর) ক্ষেত্রে ১৩.৬% অর্থাৎ, এদেশের প্রায় সোয়া দুই কোটি অধিবাসী কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে ভুগছেন, যাদের প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাগত চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন। অথচ এই ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে মানসিক চিকিৎসক ও চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানী মিলে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা সারাদেশে মাত্র ৩০০ জনের মতো, যার মধ্যে ২০০ জনের অধিক ঢাকায় বসবাসরত। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, মানসিক রোগে আক্রান্ত প্রায় ৯৪.৫% ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। এই পরিসংখ্যান অবশ্যই আতঙ্কজনক, কারণ এই বিশাল জনসমষ্টিকে বাদ দিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হওয়ার জন্য বিশেষ করে উঠতি বয়সী বা টিনএজার কিশোর এবং কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা থাকায় আত্মহত্যার প্রবণতাসহ মাদক আসক্তির মতো মানসিক রোগ সমাজে বেড়ে গেছে। এর ফলে, সামাজিক ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বেড়ে চলছে। বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। গত এক বছরে তিন কোটি ৭৭ লাখ টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করার পুলিশি রেকর্ড রয়েছে। মোট মাদকাসক্তদের ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত এবং ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত। মাদকাসক্তদের প্রায় ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী, যাদের ৭ শতাংশ হলো এইচআইভি ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত। সারাদেশে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মাদক ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে, যাদের মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জন নারী। এসব ভয়াবহ তথ্য আমরা দেখতে পাচ্ছি সমাজে মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সীমিত আকারে মনোবিজ্ঞান পড়ানো হলেও, এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসিক রোগের চিকিৎসক বা কাউন্সিলর থাকা দরকার। একটি সুস্থ-সবল সমাজ গড়ে তুলতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে তথা ২০৪২ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার যে প্রত্যয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়ন করতে গেলে এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মানসিকভাবে সুস্থ-সবল ও কর্মমুখী বাস্তবধর্মী যুবসমাজ গড়ার কোন বিকল্প নেই। সর্বজনীন মানসিক স্বাস্থ্য বিকাশের জন্য বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতিকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।’
ড. আব্দুল ওয়াদুদ আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিবহন সেক্টর থেকে শুরু করে পুলিশ, বিজিবি, আর্মিসহ সকল সেক্টরেই নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিধান থাকা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে পরিবহন সেক্টরে যে অ্যাক্সিডেন্টগুলো হয়, তার অধিকাংশই দূরপাল্লার যাত্রায় একে অপরকে টপকিয়ে যাওয়ার বা আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলে বেশি লাভবান হওয়া যাবে এই ধরনের অসুস্থ মানসিকতার কারণে হয়ে থাকে বলে বেশিরভাগ বিজ্ঞজনেরা মত দিয়েছেন। উন্নত দেশগুলোতে প্রতি বছর সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সকল স্তরে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হয়; বিশেষ করে শারীরিক এবং মানসিক অবস্থাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের পথ চলাকে সাবলীল করে রাখা হয়, যাতে করে একটি উৎপাদনমুখী সমাজে উন্নয়নের গতিশীলতা বজায় থাকে। পৃথিবীর অর্থনৈতিক উন্নয়নে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারকে ধরে রাখার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাছাড়া একজন সুস্থ সবল কর্মঠ ব্যক্তি মানসিক কারণে জরাগ্রস্ত হলে তার প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা পর্যায়ক্রমে কমে যাবে। ফলে মানসিকভাবে সুস্থ, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে জিডিপির হার এক থেকে দেড় শতাংশ বেড়ে যাওয়া সম্ভাবনা আছে, যা ২০৪২ সালের আগেই উন্নত দেশ হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যে দুর্নীতি এবং সামাজিক অস্থিরতার কথা বলা হয়, সেটিও কিন্তু এক ধরনের মানসিক রোগ। আমার কী যেন আছে, কী যেন নেই-এই ধরনের মানসিক অস্থিরতা থেকেই একজন ব্যক্তি ঘুষ এবং দুর্নীতির মতো অপরাধ জগতে ঢুকে যায়। পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রে এই ধরনের মানসিক রোগীর সংখ্যা যখন বাড়তে থাকে তখন ঘুষ এবং দুর্নীতির মতো একটি রাষ্ট্রবিধ্বংসী অপরাধকেও মানুষ স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয় এবং এটি সমাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় নিজের অজান্তে। ফলে বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে কী পরিমাণ মানসিক রোগী আছে, বিশেষ করে যারা নিয়মশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে কোনো কিছুই আমলে নিতে চায় না, তারাও এক ধরনের মানসিক রোগী। ফলে কে মানসিক রোগী বা কে মানসিক রোগী নন, সেটি মানসিক রোগের ডাক্তার ও মনোবিজ্ঞানী ছাড়া অন্য কারও পক্ষেই নির্ধারণ করা এক দুঃসাধ্য ব্যাপার, যদি না সেটি চরম পর্যায়ে পৌঁছে।’
ড. আবদুল ওয়াদুদ আরও বলেন, ‘শারীরিক সুস্থতাই শুধু সুস্থতা নয়। শরীর মন ও আত্মার সম্মিলিত সুস্থতাই প্রকৃত অর্থে সুস্থতা। দেহের সুস্থতা যেমন প্রয়োজন মনের সুস্থতাও তেমন প্রয়োজন। দেহ মন সুস্থ থাকার পরেও অশান্ত মনকে শান্ত করার জন্য মানুষ প্রশান্তি খোঁজে। শরীর সুস্থ রাখার জন্য ব্যায়ামের মাধ্যমে ফিজিওথেরাপি, মন সুস্থ থাকার জন্য পাখি বা পেটের সান্নিধ্য ক্যাথারর্সিস থেরাপি, আত্মা তথা স্পিরিচুয়ালি সুস্থ থাকার জন্য মেডিটেশনের মাধ্যমে মলিফকেশন থেরাপি সম্মিলিত সুস্থতা অর্জন করার জন্য ফিকামলি অনুশীলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে যারা দুর্নীতি করে, মাদকাসক্ত হয় ও জঙ্গিবাদে জড়ায় তারা কোন না কোন ভাবে অসুস্থ। হয় শারীরিকভাবে অসুস্থ, না হয় মানসিকভাবে অসুস্থ, না হয় আত্মিকভাবে অসুস্থ। এই তিন অসুস্থতার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে ফিকামলি অনুশীলন।’ তিনি সম্পূর্ণ ফিট ও সুস্থ থাকতে ফিকামলি তত্ত্বের আলোকে জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান। পাশাপাশি স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ফিকামলি তত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান।
দীর্ঘ ৩৭ বছর পর মনোবিজ্ঞান বিভাগের কোনো শিক্ষককে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতর পক্ষ থেকে ড. আবদুল ওয়াদুদ প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিন বাংলাদেশের প্রথম ভিসি যার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিরনের পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদ কাজী সামসুল হক ও রত্নগর্ভা মাতা মরহুমা ফাতিমা খাতুনের রুহের মাগফেরাত কামনা করে ড আবদুল ওয়াদুদ সবার কাছে দোয়া চান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী ডাক্তার দীপু মনি বলেন, ‘কোভিড১৯ এর কারণে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও মানসিক বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আবার পূর্বের ন্যায় কার্যক্রম শুরু হওয়ায় শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন-বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির সাবেক সভাপতি প্রফেসর ড. মো. রওশন আলী, সভাপতি প্রফেসর ড. মাহমুদুর রহমান, বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পিরোজপুর-এর ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. কাজী সাইফুদ্দিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অনারারী প্রফেসর ড. আজিজুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. কামাল উদ্দিন, বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. শামসুদ্দীন ইলিয়াস ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাওসার।
সম্মেলনে বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়এর মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, শ্রীলঙ্কা, ইন্ডিয়া নেপাল, ভুটান থেকে ডেলিগেটবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। দুইদিনব্যাপী বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির সম্মেলন আগামীকাল শেষ হবে।
