এলো ঐ হেমন্ত দিন...

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২২, ০৭:৩২

টলটলে মুক্তো বিন্দুর মতো শিশির জমতে শুরু করেছে ঘাসের ডগায়; ধানের শিষের ওপর। আদিগন্ত মাঠ জুড়ে এখন ধানের প্রাচুর্য, সবুজ স্বপ্ন দুলছে। হলুদে-সবুজে একাকার নয়নাভিরাম অপরূপ প্রকৃতি। চারদিকে ধূসর আবহ ঘিরে রাখছে। হিম হিম, স্বল্পায়ু দিন ক্রমে মিইয়ে যাচ্ছে, শেষ বিকালে কুয়াশার আবছা চাদর প্রকৃতিকে ঢেকে শিশিরের শব্দের মতো নামছে সন্ধ্যা।   যেন ‘সবুজ পাতার খামের ভেতর/ হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/কোন পাথারের ওপার থেকে/ আনল ডেকে হেমন্তকে...।’

আজ পয়লা কার্তিক। আবহমান বাংলায় ষ্ড়ঋতুর পরিক্রমায় ‘এলো ঐ হেমন্ত দিন...।’ শরতের পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মিলে হেমন্ত। নতুন এই ঋতুর আগমনে রূপ বদলায় প্রকৃতি। প্রকৃতির ম্লান, ধূসর ও অস্পষ্টতার অনুভূতি হানা দেয় চেতনলোকে। হেমন্তকে বলা হয় শীতের বাহন। প্রকৃতিতে অনুভূত হচ্ছে শীতের আমেজ। আকাশ থেকে পেজা তুলোর মতো শুভ্র মেঘ সরে গিয়ে উদোম হয়েছে বিশাল নীল আকাশ।

হেমন্তের সকালে শিশির ভেজা ঘাস আর হালকা কুয়াশায় প্রকৃতিতে বেজে ওঠে শীতের আগমনী বার্তা।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—‘হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা—/ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধূমল রঙে আঁকা...।’ হেমন্তের কবি জীবনানন্দ দাশ বিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতায় হেমন্তের চিত্র এঁকেছেন। ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা নামে/ ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল/ পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন....।’

গতকাল সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া আশ্বিনের শেষ সূর্যটার সঙ্গে নগরের তপ্ত শ্বাসও অস্ত যাওয়ার কথা, কিন্তু জলবায়ুর যে নিত্য বদল, তাতে এ আবহাওয়া আরো কিছু দিন থাকবে। অগ্রহায়ণে ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গে দশ প্রহরণ মেলতে শুরু করবে শীত। হেমন্তকে সবচেয়ে চেনা যায় ভোরের শিশিরে। খুব ভোরে শীতল বাতাসে। সবুজ পাতার গায়ে জমে থাকা শিশিরে।

হেমন্তের সকালে ধানের শীষে শিশিরের মুক্তদানা।

এক সময় হেমন্তের প্রথম মাসটি ছিল অনটনের। ফসল হতো না। বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যাভাব দেখা দিত। সারা বছরের জন্য জমিয়ে রাখা চাল ফুরিয়ে যেত এ সময়ে । ধানের গোলা শূন্য হয়ে যেত। কার্তিকের দুর্নাম করে তাই বলা হতো ‘মরা কার্তিক’। তবে কার্তিকের পর অগ্রহায়ণে আবার উলটো চিত্র। নবান্নের এই মাস সমৃদ্ধির। এ সময় মাঠের সোনালি ফসল কাটা শুরু হয়। দেখতে দেখতে গোলা ভরে ওঠে কৃষকের। হেমন্তের বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ। বাড়ির আঙিনা নতুন ধানে ভরে ওঠে। পুরো মাস জুড়ে সারা বাংলায় চলে নবান্ন উত্সব। বাঙালির উত্সব বলতেও হেমন্ত; যার নেপথ্যে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলার হাজার বছরের কৃষিসংস্কৃতি। বাঙালির প্রধান ও প্রাচীনতম উত্সবগুলোর অন্যতম নবান্ন।

আবহাওয়াবিদদের মতে, এখন থেকে যত দিন যাবে ততই সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমতে থাকবে। পার্থক্য যত কমবে তত শীত আসতে থাকবে। উত্তরের হিম হিম বাতাসে শুষ্ক হয়ে আসবে শরীর। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে এখন প্রকৃতি যেন আর নিয়ম মানছে না।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন