জালিয়াতি করে হাসিল করা হয় ৭ রায়

  • ‘প্রাথমিক শিক্ষকের’ চাকরি জাতীয়করণের এসব রায় স্থগিত করল আপিল বিভাগ
  • আইনের দৃষ্টিতে এই রায় বলবৎযোগ্য নয়: অ্যাটর্নি জেনারেল
আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২২, ২১:৫১

জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বাগিয়ে নেওয়া হয়েছিলো সাতটি রায়। সেসব রায়ে সাড়ে চারশত বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণে সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিলো। সেইসব রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যায় রাষ্ট্রপক্ষ। জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে এসব রায় হাসিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল। একইসঙ্গে এসব রায় বাতিলের আবেদন জানিয়েছেন তিনি। 

রিট মামলায় একের পর এক জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে দাখিল করা সৃজনকৃত নথি দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরাও। শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ হাইকোর্টের সাতটি রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে দিয়েছেন। পাশাপাশি একটি রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষকে আপিল করার অনুমতি দিয়েছে আদালত। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন-বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান, বিচারপতি বোরহান উদ্দিন ও বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম।

আদেশের বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এএম আমিন উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, জাল জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সৃজনকৃত কাগজ দিয়ে রিট করে উচ্চ আদালত থেকে সাতটি রায় হাসিল করে নিয়েছে রিটকারীরা। আইনের দৃষ্টিতে এই রায় বলবৎযোগ্য নয়। কারণ কোন ধরনের বৈধ নিয়োগপত্র ছাড়া রিটকারীদের পক্ষে রায় দিয়ে হাইকোর্ট ভুল করেছে।

২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকার দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন প্রকৃতির বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং কর্মরত শিক্ষকদের চাকরি সরকারিকরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। জাতীয়করণের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত বিদ্যালয়সমূহের সম্পদ, অবকাঠামোগত অবস্থা, পাঠদান পরিস্থিতি, শিক্ষকের যোগ্যতা ও নিয়োগ পদ্ধতি বাস্তব যাচাইয়ের মাধ্যমে অধিগ্রহণের উপযুক্ত বিদ্যালয় ও কর্মরত শিক্ষকগণের চাকরি সরকারীকরণের বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে উপজেলা/থানা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে নিম্নরূপ কমিটি গঠন করা হলো। তখন সরকার ৪ হাজার ৮২৫টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করে। ওইসব স্কুলে কর্মরত শিক্ষকদের জাতীয়করণের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়ে ২০১৬ সালে আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করে।

এই প্রজ্ঞাপন জারির পর শিক্ষকদের চাকরি জাতীয়করণের জন্য তালিকা প্রস্তুত করে যাচাই-বাছাই কমিটি। কমিটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের তালিকা প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে তাদের নামে গেজেট হয়।

তবে গেজেটে নাম অন্তর্ভুক্ত হয় নাই এমন অভিযোগে হাইকোর্টে রিট করেন মো. আনোয়ারুল ইসলামসহ ২৬ জন। পরে আরও কয়েকশত ব্যক্তি আরও ৬টি রিট করেন। যেখানে রিটকারীরা দাবি করেন যে, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, জামালপুর, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নড়াইলসহ বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তারা কর্মরত ছিলেন। তাদের নাম যাচাই-বাছাই কমিটির সুপারিশে ছিলো এবং তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু পরে চাকরি জাতীয়করণ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ওই সাত রিটের চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট সাড়ে চারশত শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করার নির্দেশ দেয়।

হাইকোর্টের সাতটি রায়ের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথক লিভ টু আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আপিল বিভাগের সেই আবেদনের ওপর শুনানি হয়। শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, প্রথম রিট আবেদনে আবেদনকারী ছিলেন ২৬ জন। এর মধ্যে বিভিন্ন জেলায় ২২ জন শিক্ষকের নিয়োগের তারিখ একই দেখানো হয়েছে। এছাড়া আরও ৬টি রিট আবেদনের প্রায় ৮০ ভাগ রিট আবেদনকারী শিক্ষকের নিয়োগের তারিখও একই উল্লেখ করা হয়েছে। 

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সরকারের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বেসরকারি শিক্ষকদের নিয়োগ একটি কমিটির মাধ্যমে হবে। যেহেতু কমিটির সাক্ষর পাওয়া যাবে না সেজন্য রিটকারীরা জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন। সেই জালিয়াতিতে দেখা যাচ্ছে এসব রিট আবেদনকারীদের কোন বৈধ নিয়োগপত্র নেই। ছিলো না কোন বেতন-ভাতার রশিদ। যেসব স্কুলে রিটকারীরা শিক্ষকতার দাবি করেছে সেটাও ভুয়া। কারণ রিটকারীরা কখনো ওইসব স্কুলে কখনো চাকরিও করে নাই। আবার কিছু রিটকারীরা কিছু নথি হাইকোর্টে দাখিল করেছেন। সেসব নথি ইস্যুর যে তারিখ দেখানো হয়েছে সেই তারিখগুলো ছিলো সরকারি ছুটির দিনে। এসব প্রমাণপত্র আমরা আপিল বিভাগে উপস্থাপন করেছি। শুনানি শেষে আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সাতটি রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করে দেন। এ সময় রিটকারী পক্ষে আইনজীবী এমকে রহমান ও রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আবন্তী নুরুল উপস্থিত ছিলেন।

এমকে রহমান বলেন, রাষ্ট্রপক্ষকে আপিলের অনুমতি দিয়েছে আপিল বিভাগ। এখন চূড়ান্ত শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ পর্যালোচনা করে আপিল বিভাগ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন। 

ইত্তেফাক/এএএম