বাউলের শিরোমনি ফকির লালন শাহের ১৩২তম তিরোধন দিবসে (১ কার্তিক) তিন দিনব্যাপী অয়োজিত অনুষ্ঠান ঘিরে বাউল-বাউলানি,ভক্ত-অনুরাগীসহ পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত লালন আখড়াবাড়ি। ভাব-জগতের মরমি গানে গানে মেতে উঠেছেন শিল্প ও দর্শক-শ্রোতরা। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়া পরিণত হয়েছে বাউলদের মিলনমেলায়। তিল ধারনের ঠাঁই নেই লালন আখড়ায়।
বাউলের শিরোমনি ও মরমি কবি ফকির লালন শাহ মানবতাবাদী-ভাবজগতের গানের গানের রাজা। প্রায় দুই শতাব্দীকাল তাঁর মানবদরদী গান মরমি মানসের তৃষ্ণা-রস মিটিয়ে আসছে। ফকির লালনের প্রধান কীর্তি হচ্ছে তাঁর গানের কথা ও সুর। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে গানের মাধ্যমে মানব প্রেম ও মানবতার জয়গান গেয়ে গেছেন। তাঁর গানের অন্তর্ময় মানবপ্রেম আজও ছুঁয়ে যায় মানুষের হৃদয়-মন।
১৭ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর আসনের এমপি মাহবুব-উল আলম হানিফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি, আ কা ম সরওয়ার জাহান বাদশা এমপি, পুলিশ সুপার খাইরুল আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীরমুক্তিযোদ্ধা আজগর আলী।
জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি মো. সাইদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার, সরকারি কৌশুলী (পিপি) অনুপ কুমার নন্দী, উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান, পৌর মেয়র সামছুজ্জামান অরুন, সাংবাদিক হাজী রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব প্রমুখ।
সভা শেষে উদ্বোধনী সংগীতের মধ্যদিয়ে শুরু হয় গানের মুল অনুষ্ঠান। এতে বাউল ও লালন একাডেমির শিল্পিরা গানে গানে মাতিয়ে রাখেন দর্শক-শ্রোতাদের। দুর-দুরান্তের হাজার হাজার নারী-পুরুষসহ লালন ভক্তরা ছুটে আসেন মুল মঞ্চের সামনে সুসজ্জিত সুবিশাল প্যান্ডেলে। লালনের মানবতাবাদী গানে গানে হৃদয় ছুঁয়ে যায় দর্শক-শ্রোতাদের। রাতভর চলা এই লালন সঙ্গীতের সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যান লালন ভক্তসহ হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা। শিল্পীদের কণ্ঠে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লালনের আদি সুরের গান শিল্পীদের কণ্ঠে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লালনের আদি সুরের সংগীতানুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে কোন দাওয়াত পত্রের প্রয়োজন হয় না। দিনক্ষণ হিসাবে করেই সাধু-ভক্তরা অনুষ্ঠানে আসতে প্রহর গুনতে থাকেন।
লালন ভক্তরা জানান, লালন ফকির জীবদ্দশায় ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে সাধ-ভজন, আরাধনা ও গান করতেন অনেকটা সেই আবহ ও আদলেই চলছে গানের আসর। লালন আখড়া আগত হাজার হাজার দর্শনার্থীর মধ্যে বাউল-বাউলানীর সংখ্যা দুই সহস্রাধিক।
কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম জানান, লালন ফকির এখন শুধু কুষ্টিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বে তার গান ও দর্শন ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে দেশ-বিদেশে গবেষণাও চলছে। ‘মানুষ ভজলে হবি সোনার মানুষ’ ফকির লালনের এই অহিংস মর্মবাণী ছড়িয়ে মানুষে মানুষে ভালবাসার বন্ধন সৃষ্টি করতে তাগিদ দেন সাধু-ভক্তরা। লালনের ভাব-জগতের গান ও দর্শন প্রচারের মাধ্যমে সর্বত্র শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন বাউলরা। আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালনের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা-ভক্তি, গান উপভোগ ও তাঁর রহস্যঘেরা অজানা কীর্তিকে জানতে অনুষ্ঠান চলাকালে দেশি-বিদেশি পর্যটকসহ হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন প্রাণের টানে। প্রতি বছরের মত এবারও তিরোধান দিবস ঘিরে আয়োজিত স্মরণোৎসব সাধু-ভক্ত ও হাজার হাজার দর্শনার্থীর ভিড়ে মহামিলনের মহাউৎসবে পরিণত হয়েছে লালন আখড়া।
কালিগঙ্গা নদীর পাড়ে গানের মূল অনুষ্ঠান ছাড়াও অডিটোরিয়ামের নীচতলায় উন্মুক্ত চত্বরে বসেছে সাধুর হাট। সাধুসঙ্গ ও খন্ড খন্ড গানের আসর এনে দেয় আলাদা বৈচিত্র্য। পার্থিব সব কিছু ভুলে মানবতাবাদী ও মরমী গানের সুরের মধ্যে বাউলরা ফকির লালনের আধ্যাত্মিকতাকে খুঁজে পেতে একাত্ম হয়ে যান। গানের অনুষ্ঠান ছাড়াও বিশাল মাঠে বসেছে গ্রামীণ মেলা। এ মেলার ৪ শতাধিক স্টলে বিভিন্ন জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানীরা।
উল্লেখ্য, লালন শাহ ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর ইচ্ছানুযায়ী আখড়া ঘরের মধ্যেই ফকির লালনকে সমাহিত করা হয়। এছাড়া মাজারের মধ্যেই বামপাশে লালন ফকিরের পালক মা মতিজান ফকিরানীকে কবরস্থ করা হয়। পরে ১৯৬৩ সালে ফকির লালন ও তাঁর পালক মায়ের সমাধিস্থলকে ঘিরে নয়নাভিরাম মাজার তৈরি করা হয়। মাজারের সামনে ফকির লালনের প্রথম ভক্ত শীতল, জাগো শাহ ফকির, জাগো শাহ ফকিরের স্ত্রী ও বিশাখা ফকিরানীর কবর।
এছাড়া মাজার চত্বরের সামনেই লালনের পালিত পিতা মওলানা মলম শাহ, মকছেদ আলী সাঁই,ভোলাই শাহ,ফকির গোলাম ইয়াসিন শাহ,লতিফ শাহ ফকির,ফকির আজিজ উদ্দিন শাহ,গুরু মহিম শাহ,কুসুম ফকিরানী,শান্তি ফকিরানী,জাগো শাহ,কামিনী ফকিরানী ও প্যারী নেসা ফকিরানীর সমাধিস্থল।
