রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শতবর্ষে অগ্নিবীণা

‘বিষের বাঁশি’র মধ্যেও অগ্নিবীণা

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২২, ১১:২৫

কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের শতবর্ষ পূর্তি হচ্ছে ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর মোতাবেক ১৪২৯ বঙ্গাব্দের ৮ কার্তিক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এ এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। সেইসঙ্গে বিশ্ব কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসেও এক অনন্য সাধারণ ভুক্তি। ‘অগ্নিবীণা’ হচ্ছে বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, মানবতার কবি, সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ (১৯২২)। ভাব, ভাষা, ছন্দ, শব্দ এবং ধ্বনি ঝংকারে মুখরিত এই গ্রন্থের সব কবিতা।

কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘ব্যথার দান’। এই গল্পগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মোতাবেক ১৩২৮ বঙ্গাব্দের মাঘ-ফাল্গুনে। নজরুল রচিত প্রকাশিত দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। এই কাব্যগ্রন্থ যখন প্রকাশিত হয় তখন নজরুল ‘বিদ্রোহী’ কবি হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছেন এবং উপমহাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা তখন টালমাটাল খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে।

‘অগ্নিবীণা’ নজরুলের প্রথম কাব্য। এই গ্রন্থে মোট ১২টি কবিতা রয়েছে। কবিতার শিরোনামগুলো হচ্ছে: প্রলয়োল্লাস, বিদ্রোহী, রক্তাম্বরধারিণী মা, আগমনী, ধূমকেতু, কামাল পাশা, আনোয়ার, রণভেরী, শাত-ইল আরব, খেয়াপারের তরণী, কোরবানী ও মোহররম।

‘অগ্নিবীণা’ যখন ছাপা হচ্ছিল তখন এই গ্রন্থে ‘বন্দী-বন্দনা’, ‘মরণ-বরণ’, ‘জাগরণী’, ‘অভয়মন্ত্র’, ‘ভাঙার গান’ প্রভৃতি গান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীকালে এই গানগুলোর মধ্যে ‘অভয়মন্ত্র’, ‘মরণ-বরণ’ ও ‘বন্দী-বন্দনা’, ‘বিষের বাঁশী’ (প্রথম প্রকাশ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ১৬ শ্রাবণ) এবং ‘ভাঙার গান’ ও ‘জাগরণী’ (প্রথম প্রকাশ ১৩৩১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ) গ্রন্থভুক্ত হয়।

কাজী নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ কলকাতা থেকে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট মোতাবেক ১২২৯ বঙ্গাব্দের ২৬ শ্রাবণ প্রথম প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞাপনে লেখা হয়:

“‘ধূমকেতু’- সারথি ‘বিদ্রোহী’র সৈনিক-কবি

কাজী নজরুল ইসলাম-এর

কবিতার বই

অগ্নিবীণা! অগ্নিবীণা!!

ছাপা হচ্ছে’ — দাম এক টাকা।”

বিজ্ঞাপনে আরো লেখা হয়:

“এতে থাকবে কবির আজতক লেখা সমস্ত গরম কবিতা ও গান। যেমন, ‘বিদ্রোহী’, ‘কামালা পাশা’, ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘ধূমকেতু’, ‘আনোয়ার’, ‘কোর্ব্বাণী’, ‘মোহরম’, ‘শাতিল আরব’, ‘রণ-ভেরী’, ‘আগমনী’ প্রভৃতি কবিতা এবং ‘বন্দী-বন্দনা’, ‘মরণ-বরণ’, ‘জাগরণী’, ‘অভয়মন্ত্র’, ‘ভাঙার গান’ প্রভৃতি গান। যাঁরা বই কিনতে চান তাঁরা অনুগ্রহ করে আজই চিঠি দিয়ে নাম রেজিস্ট্রি করে রাখুন, কিংবা টাকা পাঠিয়ে দিন...। শান্তিপদ সিংহ। ৩২ কলেজ স্ট্রীট (ওপরতলা) কলিকাতা।”

‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থ ‘ছাপা হচ্ছে’ এই বিজ্ঞাপনটি ‘ধূমকেতু’র পরবর্তী সংখ্যাগুলোতে নিয়মিতভাবে ছাপা হতে থাকে। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ অক্টোবর মোতাবেক ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৭ কার্তিক মঙ্গলবার ‘ধূমকেতু’র দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশের বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। বিজ্ঞাপনে লেখা হয়:

‘অগ্নিবীণা! বের হল

কাজীর ফটোসহ সুদৃশ্য বাঁধাই — দাম এক টাকা।’

বিজ্ঞাপনে প্রাপ্তিস্থান উল্লেখ করা হয়—‘আর্য্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ স্ট্রীট মার্কেট, কলকাতা’। ‘ধূমকেতু’র একই সংখ্যার তৃতীয় পৃষ্ঠায় একেবারে উপরের দিকে (রুলেরও উপরে) প্রায় পৃষ্ঠাজুড়ে বড় বড় অক্ষরে এক টাকা করে মূল্যসহ ছাপা হয় ‘কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণা ও যুগবাণী বাহির হল’। দুটি গ্রন্থেরই বিজ্ঞাপন ডান কলামেও ছাপা হয় আলাদাভাবে। এই বিজ্ঞাপন থেকে প্রমাণিত হয় যে, নজরুলের কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’ ও প্রবন্ধ-গ্রন্থ ‘যুগবাণী’ একই সময়ে, একই মাসে এবং একই দিনে ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ অক্টোবর মোতাবেক ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৭ কার্তিক মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়।

‘অগ্নিবীণা’ কাব্যের দ্বিতীয় খণ্ড শিগগিরই বের হবে বলে ১৯২২ সালের ৩১ অক্টোবর ‘ধূমকেতু’র প্রথম পৃষ্ঠায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এই বিজ্ঞাপনে অগ্রিম টাকা (প্রতি কপির মূল ডাকমাসুলসহ ১ টাকা ২৫ পয়সা) জমা দিয়ে গ্রাহক হওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে ‘অগ্নিবীণা’র দ্বিতীয় খণ্ড শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। এ সম্পর্কে নজরুল ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থে ‘কৈফিয়ত’ শিরোনামে লিখেছেন;

“‘অগ্নিবীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেই সব কবিতা ও গান দিয়ে এই ‘বিষের বাঁশী’ প্রকাশ করলাম। বিশেষ কারণে কয়েকটি কবিতা ও গান বাদ দিতে বাধ্য হলাম। কারণ আইনরূপ ‘আয়ান ঘোষ’ যতক্ষণ তার বাঁশ উঁচিয়ে আছে, ততক্ষণ বাঁশীতে তথাকথিত ‘বিদ্রোহ’-রাঁধার নাম না নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। ঐ ঘোষের পো-র বাঁশ বাঁশীর চেয়ে অনেক শক্ত...।”

যাই হোক, নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশী’ ভিন্ন ভিন্ন নামে হলেও একই উত্সধারা নিঃসৃত-নিক্ষিপ্ত আগুনের গোলা যেন; শিল্পের নন্দিত ভুবনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনেও।

‘অগ্নিবীণা’র প্রথম সংস্করণ ১৯২২ সালের অক্টোবরে বের হয় আর নভেম্বর মাসেই গ্রেফতার হন কাজী নজরুল ইসলাম ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য। কবিতাটিও বাজেয়াপ্ত হয়। সেইসঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয় তাঁর গ্রন্থ ‘যুগবাণী’ও।

শতবর্ষ পার হলেও নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’র তেজোদীপ্ত সুর অতীতের মতো বর্তমান এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে জাগরণের মহামন্ত্রে উদ্দীপ্ত করবে।

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন