হরতালে গাড়ি চলে, সমাবেশে বন্ধের কারণ কী?

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২২, ২২:০০

বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশকে সামনে রেখে ঘোষিত ও অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘট এখন আলোচনায়। ময়মনসিংহে ছিলো অঘোষিত আর খুলনায় হয়েছে ঘোষণা দিয়ে। পরিবহণ ধর্মঘটে মারাত্মক ঝামেলায় পড়েন যাত্রীরা। খুলনার সমাবেশের আগে ধর্মঘটের কারণে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তির খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হযেছে।

তবে পরিবহণ খাতের নেতারা বলছেন, নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকায় যান চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছে তাদের। তবে কোনো কোনো নেতা অবশ্য বিষয়টিকে রাজনৈতিক বলে মন্তব্য করছেন।   

আগামী ২৯ নভেম্বর রংপুর এবং ৫ নভেম্বর বরিশালে সমাবেশ করবে বিএনপি। প্রশ্ন উঠেছে, সেসময়ও কি পরিবহণ ধর্মঘট চলবে?

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপদি মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, ‘‘মালিকরা নিরাপত্তা না পেলে গাড়ি চালাবে না।'' গাড়ি ভাঙচুর হলে কি বিএনপি ক্ষতিপূরণ দিবে- এমন প্রশ্ন তার।

চালু ও বন্ধ মালিকদের ইচ্ছায়

খুলনায় পরিবহণ মালিকদের ধর্মঘট ছিলো অনির্দিষ্টকালের। তারা এই ধর্মঘট ডেকেছিলো নসিমন , করিমন, ভটভটি বন্ধের দাবিতে। দাবি পূরণ বা প্রশাসন থেকে কোন আশ্বাস না পেলেও বিএনপির সমাবেশ শেষ হওয়ার পর, গণপরিবহণ চলছে, চলছে নসিমন, করিমন, ভটভটি।

খুলনা পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতিকে এ বিষয়ে কথা বলার জন্য পাওয়া যায়নি। কথা হয় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হেসেন সোনার সঙ্গে।

 তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ধর্মঘটটি কাকতালীয়ভাবে বিএনপির সমাবেশের সঙ্গে মিলে গেছে। কয়েকদিন আগে করলে ভালো হতো। আর আরো কয়েকদিন ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়া ভালো ছিলো। আমরা ভাই ভটভটি, নসিমন, করিমনের জালায় অতিষ্ট। আর নিরাপত্তার প্রশ্নও ছিলো।''

বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমাবেশের সময় গণপরিবহণ বন্ধ  থাকে, আবার হরতাল ডাকলে গণপরিবহণ চালানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। হরতালে তো গাড়ি ভাঙচুর হতে পারে তখন কেন কেন গাড়ি চালানো হয়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘ঠিক বলেছেন। কিন্তু আমি কী জবাব দিয়ে আবার ফাঁন্দে পড়ে যাই।''

‘আমাদের যেভাবে ভালো হয় সেভাবে করি'

ময়মনসিংহে বিএনপির সমাবেশের সময়ও মালিকরা পূর্ব ঘোষণা ছাড়া হঠাৎ গণপরিবহণ বন্ধ করে দেন। ময়মনসিংহ পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘‘আগে বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের সময় ময়মনসিংহে একাধিক বাসে আগুন দেয়া হয়। তাই শ্রমিকরা ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে চাচ্ছিলেন না। এবার আমরা শ্রমিকদের ও গাড়ির নিরাপত্তার জন্য গণপরিবহণ বন্ধ রেখেছিলাম।''

তাহলে হরতালের সময় গাড়ি চালান কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘আপনি কি মালিক? আমরা মালিক। আমরা আমাদের যেভাবে ভালো হয় সেভাবে করি।''

তিনি দাবি করেন, তাদের এই সিদ্ধান্তের পিছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ নেই।

এদিকে ময়মনসিংহ পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি হারুন অর রশীদ বলেন, ‘‘আমরা গণপরিহণ বন্ধ রাখতে বলিনি। বন্ধ থাকার কারণে তো আমরা শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। মালিকরা বলেছেন গাড়ি ভাঙচুর হবে তাই তারা তাদের গাড়ি চালাবেন না। আমরা কী করতে পারি।''

মালিকরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘সামনাসামনি আসেন বিস্তারিত বলব।’’

ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে মালিক সমিতির সংশ্লিষ্টতা

তবে খুলনার মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বিপ্লব বলেন, ‘‘গণপরিবহণ বন্ধ রাখা হয়েছিলো রাজনৈতিক কারণে। আমাদের সঙ্গে কোনো আলাপ করা হয়নি। এখন যে আবার গণপরিবহণ চালু হয়েছে তাও মালিকদের ইচ্ছায়। আমরা দুই দিন ক্ষতিগ্রস্ত হলাম। ওই দুই দিনে আমাদের কোনো আয় নেই।’’

আওয়ামী লীগের কোনো নির্দেশ ছিল কী না প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘‘মালিক সমিতির প্রায় সব নেতাইতো আওয়ামী লীগের। একজন আছেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি। খুলনায় পরিবহণ মালিক নেতাদের একমাত্র গাফফার বিশ্বাস ছাড়া সবাই আওয়ামী লীগের।’’

বাংলাদেশের পরিবহণ মালিকদের সংগঠনগুলো সবসময়ই সরকার নিয়ন্ত্রিত থাকে। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে নেতৃত্বও সেই দলের নেতাদের হাতে থাকে। বিএনপির আমলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। আর এখন জাতীয় পার্টির নেতা মশিউর রহমান রাঙ্গা। বিরোধীদের আন্দোলন বা সমাবেশ দমাতে গণপরিবহণ বন্ধ বিএনপির আমলেও করা হয়েছে। এমনকি তখন আওয়ামী লীগের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঠেকাতে সড়ক, নৌপথে গণপরিবহণ বন্ধ করে সারাদেশ থেকে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল।

সড়ক পরিবহণ শ্রমিক লীগের সভাপতি হানিফ খোকন বলেন, ‘‘পরিবহণ মালিকরা সবসময়ই সরকারের কথায় চলে। আবার সরকারও তাদের অনেক অযৌক্তিক দাবি মেনে নেয়। তারা ইচ্ছেমত ভাড়া আদায় করে। যাত্রী হয়রানি করে। সড়কে আনফিট যানবাহন চলাচল করে। এটা লেনদেনের বিষয়।’’

তিনি বলেন, ‘‘মালিকদের অনেক সময় বলতেও হয় না। তারা জানে সরকারকে খুশি করতে কখন কী করতে হবে। আর শ্রমিকদের কিছু  করার থাকে না। মালিকরা পরিবহণ বন্ধ করে দিলে তারা কী করবে।’’

পরিবহণ সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি জানান, এটা একটা ধারায় পরিণত হয়েছে। যে কোনো সরকারের সময় বিরোধী দল যখন হরতাল ডাকে তখন পরিবহণ মালিকরা যানবাহন চালানোর ঘোষণা দেন। আর যখন বিরোধীরা অবরোধ, বড় সমাবেশের ঘোষণা দেন তখন তারা নানা অজুহাতে পরিবহণ বন্ধ করে দেন।

রংপুর, বরিশালে কী ঘটবে?

আগামী ২৯ নভেম্বর রংপুরে সমাবেশ করবে বিএনপি। এ বিষয়ে রংপুরের এক পরিবহণ মালিক নেতা জানান, ‘‘আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। গণপরিবহণ সমাবেশের সময় চলবে কী না আমরা পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেব। তবে আমরা নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখছি। আমাদের সব দিক সামলাতে হবে।''

আর রংপুর মটর মালিক সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি এ কে চৌধুরী ক্যাপ্টেন বলে বলেন, ‘‘সমাবেশের তো আরো কয়েকদিন বাকি আছে। আমরা কী করব তা সমাবেশের আগে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব।’’

এদিকে বরিশালের পরিবহণ খাতের নেতাদের  সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও সমাবেশের আগে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।

মালিক সমিতি যা বলছে

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতি ও জাতীয় পার্টির এমপি মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘‘দেশের কোন এলাকার পরিবহণ মালিকরা ধর্মঘট করে তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করি না। এটা তাদের ব্যাপার। তবে ময়মনসিংহ আর খুলনার মালিকদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি তারা নিরাপত্তার কারণে গাড়ি বন্ধ রেখেছেন। কোটি কোটি টাকার গাড়ি ভাঙলে ক্ষতিপুরণ দেবে কে? বিএনপি দেবে? নিরাপত্তা যেখানেই পাওয়া যাবে না সেখানেই গাড়ি বন্ধ রাখা হবে।’’

তাহলে হরতালের সময় গাড়ি চলে কেন, তখন কি গাড়ি চালানো নিরাপদ? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘২০১৪ সালে বিএনপির হরতালের মধ্যে আমরা গাড়ি চালিয়েছি। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বলেছেন গাড়িতে হামলা করা হলে, আগুন দেয়া হলে মামলা করুণ ক্ষতিপুরণ দেব। তিনি পরে ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছেন। এখন কে দেবে? বিএনপি দেবে? তারা ক্ষতিপূরণ দিক আমরা গাড়ি চালাবো।’’

আর গত আগস্টে বাম সংগঠনগুলোর আধাবেলা হরতালের সময় গাড়ি চালানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘তখন তো ভাঙচুর হয়নি, তাই গাড়ি চলেছে।’’

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি