শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

বুঝিব কেমনে: কে পুলিশ আর ছিনতাইকারী কোন জন

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ০২:০০

পুলিশের কিছু সদস্য ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। আর এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। মানুষ বুঝতে পারছে না কে পুলিশ আর কে ছিনতাইকারী। শুধু ছিনতাই নয় পুলিশ সদস্যরা ডাকাতি, প্রতারণাসহ মামলার হুমকি দিয়ে টাকা আদায়ের মত অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। আরো আছে পকেটে মাদক ঢুকিয়ে মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়৷

পুলিশের ছিনতাই স্পট মতিঝিল

১৫ লাখ টাকা ছিনতাই করে ধরা পড়েছেন তিন পুলিশ সদস্য। সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ার কারণে তাদের রক্ষা করা যায়নি। ওই তিন পুলিশ সদস্য হলেন, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের তিন পুলিশ কনস্টেবল কামরুল ইসলাম, রাাফিজ খান এবং তুষার ইমরান। এদের মধ্যে কামরুল ইসলাম আরেকটি অর্থ অনিয়ম মামলায় আগে থেকেই বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।

১৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাটি গত ১২ অক্টোবরের। তারা নিজেদের সিআইডির সদস্য পরিচয় দিয়ে ওই দিন মতিঝিল এলাকার তিন জনের কাছ থেকে মোট ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। মতিঝিলের একটি প্রতিষ্ঠানের ওই তিন জন কর্মচারী একটি মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ৩০ লাখ টাকা তোলেন। টাকা নিয়ে তারা রিকশায় অফিসে রওয়ানা হলে ওই তিন কনস্টেবলসহ চার-পাঁচজন রিকশার গতিরোধ করে নিজেদের সিআইডির লোক পরিচয় দিয়ে তাদের তাদের কমলাপুরের দিকে নিয়ে যান। পথিমধ্যে সুমন নামে একজন কর্মচারী তার ব্যাগে থাকা ১৫ লাখ টাকা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। বাকি দুই জনকে খিলগাঁও চৌরাস্তা মসজিদের কাছে নিয়ে তাদের কাছে থাকা ১৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে একটি অটোরিকশায় তুলে দেন ওই তিন পুলিশ কনস্টেবল।

পরে তারা মতিঝিল থানায় অভিযোগ করলে ওইসব এলাকার কমপক্ষে ৫০টি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা তিন পুলিশ  কনস্টেবলকে চিহ্নিত করে ২১ অক্টোবর তাদের গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করেন। তারা এখন কারাগারে আছেন।

বেপরোয়া পুলিশ

অবশ্য পুলিশ সদস্যদের ছিনতাইসহ আরো অপরাধের কাহিনি এই প্রথম নয়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর থেকে বের হবার পথে দুবাই ফেরত এক যাত্রীর মাইক্রোবাস থামিয়ে পিস্তল ঠেকিয়ে ২২ লাখ টাকার মালামাল ও বিদেশি মুদ্রা ছিনতাই করেন পাঁচ পুলিশ সদস্য ও তার সহযোগীরা। তারা হলেন পুলিশ কনস্টেবল সালাউদ্দিন ও সুমন এবং তাদের সহযোগী তোফাজ্জল, আলী ও সাইফুল। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। তারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।

গত সেপ্টেম্বরে পল্লবী থানা এলাকায় খলিলুর রহমান নামে এক পথচারীর পকেটে ইয়াবা দিয়ে আটক করে পুলিশ। এরপর টাকা চেয়ে না পেয়ে তার বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও করে তারা। পরে অবশ্য ঘটনা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হলে দুই পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এদিকে গত জুনে ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ে ডাকাতি মামলার বাদীর পরিবারের এক নারীকে ডিবি অফিসে জিজ্ঞাসাবাদের নামে তিন দিন আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুধু নির্যাতন নয়, তার পরিবারের কাছ থেকে এক লাখ ৫০ হজার টাকা আদায়ের চেষ্টাও করা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেনীর সোনাগাজী  মডেল থানার এএসআই মো. জহিরুল হক, কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন ও কায়ছার হামিদকে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ক্লোজড করা হয়। তারা রাতে ব্যবসায়ী শেখ ফরিদকে ইয়াবা বিক্রেতা আখ্যা দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে মারধর করেন। পরে ব্যবসায়ীর কাছে থাকা দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে দেন।

১৩ ফেব্রুয়ারি মোবাইল ফোন ছিনতাই করতে গিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ায় জনতার হাতে ধরা পড়েন আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নের (এপিবিএন) নিরঞ্জন দাস নামে এক সদস্য। তিনি ভয় দেখিয়ে এক যুবকের মোবাইল ফোন ছিনতায়ের চেষ্টা করছিলেন।

গত বছরের ১ মার্চ  বিকেলে কক্সবাজার শহরের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার  রোজিনা খাতুনের বাড়িতে ঢুকে পিস্তল ঠেকিয়ে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়ার সময় জনতার হাতে আটক হন এ এস আই নূরুল হুদা, কনস্টেবল মুমিনুল মামুন ও মামুন মোল্লা।  জনতা ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ গিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের বিরুদ্ধে কত অভিযোগ

শুধু ছিনতাই নয় পুলিশ সদস্যরা হত্যা ও ডাকাতিসহ আরো অনেক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরে ২০১৮ সালে ১৪ হাজার ৪০২ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। ২০১৯ এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৫১২। ২০২০ সালে আরও বেড়ে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫ হাজার ২১২। ২০২১ সালে ১৬ হাজার ৪১৮ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ জমা পড়ে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায় গত কয়েক বছরের হিসেবে দেখা যায় প্রতি বছর গড়ে ৯ হাজারের মত পুলিশ সদস্যকে বিভিন্ন অভিযোগে গুরু এবং লঘু দণ্ড দেয়া হয়। তবে এই শাস্তির মধ্যে চাকরিচ্যুতি খুবই কম। সাধারণভাবে বদলি, ভর্ৎসনা এসবের মধ্যে সীমবাদ্ধ। আর শাস্তিপ্রাপ্তরা অধিকাংশই এসআই, এএসআই ও কনেস্টবল পদ মর্যাদার। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা শাস্তির আওতায় এসেছেন এমন নজির হাতে গোানা যায়।

সাধারণ মানুষ ভয়ের মধ্যে আছে

মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন," পুলিশ সদস্যরা চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মত ঘটনায় জড়িয়ে পরায় সাধারণ মানুষ ভয়ের মধ্যে আছেন। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তারা কোথায় আশ্রয় পাবেন এটাই এখন বড় প্রশ্ন।”

তার কথা,"পুলিশের অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না বলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। সাসপেন্ড, ক্লোজড আসলে কোনো শাস্তি নয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা যেমন নিতে হবে তেমনি ফৌজদারি ব্যবস্থাও নিতে হবে। আর তারা এখন নিজেদের অনেক বেশি ক্ষমতাধর মনে করছেন। ফলে যে যার লেভেলে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। ”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান মনে করেন, "পুলিশের মধ্যে কোথাও কোনো একটা ফাঁক আছে যার মাধ্যমে  অপরাধ করে পার পাওয়া যায়। এই কারণেই পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশের জবাবদিহি এবং অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত না হলে এটা বন্ধ করা সম্ভব নয়।”

তিনি বলেন," আগে ছিল পুলিশের পোশাক পরে ছিনতাই ডাকাতির ঘটনা। আর এখন দেখছি সরাসরি কিছু পুলিশ সদস্য এইসব  অপরাধ করছে। তাহলে নাগরিকেরা তো কে পুলিশ কে ছিনতাইকারী চিনতে পারবে না।”

তার কথা,"পুলিশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। পুলিশ অপরাধ করলে তো দুইগুণ বেশি শাস্তির বিধান থাকা উচিত। কারণ যার কাছে মানুষ নিরাপত্তা পাবে সেই যদি অপরাধ করে তাহলে মানুষ যাবে কোথায়?”

আর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক প্রধান ও সাবেক ডিআইজি সৈয়দ বজলুল করিম বলেন,"ছিনতাই ডাকাতির মত ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের জড়িয়ে পড়া চরম দুর্ভাগ্যজনক। এখানে নেতৃত্বের সংকট আছে। চেইন অব কমান্ডের সমস্যা আছে। পিআরবিতে এবং প্রচলিত আইনে এই ধরনের অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান আছে। সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”

তার কথা," অনেকে পুলিশের পোশাক পরলেই যেন সাধারণ মানুষকে ভুলে যান। তিনি আর নিজেকে সাধারণ মনে করেন না। ক্ষমতাধর মনে করেন। এটাই সমস্যা। পুলিশের  সব পর্যায়ে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।”

 

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন হারুন উর রশীদ স্বপন। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।

ইত্তেফাক/জেডএইচডি