শুধু তৃণমূল নেতাকর্মীরাই নন, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও পদবাণিজ্য নিয়ে মুখ খুলছেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি দলের বিভিন্ন স্তরে আর্থিক লেনদেনের খবরে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা দলটাকে বাঁচান। টাকা-পয়সার লেনদেন—এগুলো বন্ধ করেন। কমিটি করতে টাকা লাগবে, এটা বিএনপির হতে পারে, আওয়ামী লীগ এ চর্চা করতে পারে না। টাকা-পয়সা নিয়ে মনোনয়ন—এ চর্চা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। বিষয়টি দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ।’ গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর খিলগাঁও মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগের খিলগাঁও থানা এবং ১, ২, ৩ ও ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি, একজন আরেক জনের বিরুদ্ধে গিবত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, টাকা-পয়সার লোভ দলীয় সভানেত্রীর নেই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের নেই। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদেরও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সততা-সাহস থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
গত বছর ১৬ জুন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সদস্যপদ নবায়ন ও প্রাথমিক সদস্যপদ বিতরণ অনুষ্ঠানে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি বলেছিলেন, ‘এই মুহূর্তে পদবাণিজ্য সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। এখানে কোনো বিনিয়োগ লাগে না। দল একটানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। দেখা যাবে, অনেকে ব্যবসা করতে গিয়ে পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। ঋণখেলাপি হয়েছেন। আবার কেউ কেউ শেখ হাসিনার দেওয়া দায়িত্ব (পদ-পদবি) পেয়ে কমিটি গঠন করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য করেছেন।’ মির্জা আজমের এই বক্তব্যের ভিডিও পরে দলের ত্যাগী নেতারা নিজেদের ফেসবুকে শেয়ার করেন। তারা মির্জা আজমের বক্তব্যকে সমর্থন জানান। তবে দলের একাধিক নেতা পদবাণিজ্যের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে তৃণমূলে একাধিক নেতা পদবাণিজ্যের কথা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, যারা পদবাণিজ্যের কথা বলেন তারা দলকে বিতর্কিত করতে চান।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে আওয়ামী লীগ। চলছে মহানগর-জেলা-উপজেলা-থানা-ইউনিয়ন-ইউনিট সম্মেলন। ৭৮টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ইতিমধ্যে অর্ধেকের বেশি সম্মেলন শেষ করেছে দলটি। তবে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমনের যে উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে তা আদতে হচ্ছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে, তৃণমূল আওয়ামী লীগে ‘পকেট কমিটি’ ও ‘পদবাণিজ্যের’। ফলে সংগঠন শক্তিশালী নয়, দুর্বলই থেকে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন বিভিন্ন এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এদিকে পদের দরও বেড়েছে। আগের চেয়ে দ্বিগুণ হারে পদবাণিজ্য হচ্ছে বলে তৃণমূলের নেতারা অভিযোগ করছেন। তবে পদপ্রত্যাশী প্রার্থীর অভাব নেই। আর এই পদবাণিজ্যের অর্থের ভাগ পান দলের তিন স্তরের একশ্রেণির নেতা। তৃণমূলের একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন।
২০১৯ সালের ২০-২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন বছর মেয়াদি এ সম্মেলনের মেয়াদ শেষ হবে এ বছর ডিসেম্বরে। এর আগে জেলা-উপজেলা সম্মেলন শেষ করতে চলছে সাংগঠনিক কর্মযজ্ঞ। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ইউনিট, ওয়ার্ড-থানা সম্মেলন শেষ হয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ইউনিট, ওয়ার্ড ও থানা সম্মেলন প্রায় শেষ পর্যায়ে। এদিকে সম্মেলন হলেও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণের অধীনে থানা-ওয়ার্ডের কোনো কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। আগামী মাসে সবগুলো একসঙ্গে ঘোষণা করা হতে পারে। জানা গেছে, কমিটি ঘোষণা না হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার জন্য মহানগরের একশ্রেণির নেতা পদপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে বায়োডাটা নেওয়া শুরু করেছেন। এক্ষেত্রে অর্থেরও লেনদেন হচ্ছে। অপরদিকে, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর দক্ষিণ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ ও তাঁতী লীগের সম্মেলনের দিনক্ষণ নির্ধারণ হতে যাচ্ছে আগামীকাল শুক্রবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘পদবাণিজ্যের অভিযোগ পুরোপুরি সত্যি নয়। দুই-একটি অভিযোগ সত্যি হতে পারে। পকেট কমিটির ব্যাপারটিও একেবারে ঠিক নয়। দুয়েক জায়গায় হতে পারে।’ তবে তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্র থেকে নেতা আসছেন। কিন্তু ঐ সব নেতা স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে আলোচনা করে পকেটে করে একটি কাগজ নিয়ে আসেন। সম্মেলনস্থলে এসে পকেট থেকে ঐ কাগজ বের করে নাম ঘোষণা করে চলে যান। এভাবে দলকে শক্তিশালী করা হয় নাকি আরো দুর্বল করা হয় প্রশ্ন করেন তারা। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না, তারা রীতিমতো ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে বেশ কয়েকটি উপজেলায় সম্মেলন স্থগিত করার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে ‘দলীয় পদবাণিজ্য’—কথাটা শুনলেই বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে যান অনেক নেতা। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের নেতাদের বিরুদ্ধে পদবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে, তবে পরে এর তেমন সত্যতা মেলেনি। অনুপ্রবেশকারী বা হাইব্রিড নেতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে দলীয় পদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার কঠোর হুঁশিয়ারির মধ্যেও কতিপয় নেতা জেলা, মহানগর, থানা ও ওয়ার্ডের কমিটি করতে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। তবে ‘পদবাণিজ্য’ আসলে হয় কি না—তা নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করেছেন দলের সিনিয়র নেতারা। বিষয়টি আরো গভীরভাবে খতিয়ে দেখার পক্ষে তারা।
