'কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূলমন্ত্র, শান্তি-শৃঙ্খলা সর্বত্র' প্রতিপাদ্যে আজ দেশব্যাপী পালিত হলো কমিউনিটি পুলিশিং ডে-২০২২। এ উপলক্ষে শনিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে এক বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করা হয়। র্যালিটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে এসে শেষ হয়। পরে রাজারবাগে বাংলাদেশ পুলিশ অডিটোরিয়ামে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বিপিএম (বার), পিপিএম। মুখ্য আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এছাড়া বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. আতিকুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার এবং মিরপুর মডেল থানার কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি দেওয়ান আব্দুল মান্নান।
অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত আইজিপিগণ, ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণ এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কমিউনিটি পুলিশের সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কাজ হলো সমাজে অপরাধ সংগঠিত হওয়ার আগেই অপরাধীকে চিহ্নিত করা, অপরাধীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা। আমরা এক্ষেত্রে শতভাগ সফল হয়েছি। ভবিষ্যতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সমাজকে আরো কীভাবে সুন্দর করা যায়, পরিচ্ছন্ন করা যায়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।
তিনি বলেন, কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের ফলে সমাজে বাল্য বিবাহ, ইভটিজিং অনেক কমেছে। এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে আমরা যখন কঠিন সমস্যার মুখে পড়েছিলাম, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সর্বস্তরের জনগণকে ঘুরে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছিলেন। তখন সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যার যার জায়গা থেকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। সে সময় আমরা অভূতপূর্ব সফলতা দেখেছিলাম। জনগণ যখন পাশে থাকে কোন কিছুই আর অসাধ্য থাকে না।
মন্ত্রী আরও বলেন, এক সময় গ্রামে বিচার ব্যবস্থা ছিল, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের লক্ষ্যও একই রকম। আমরা নিজেরা যদি নিজের সমস্যা সমাধান করতে পারি সমাজ অপরাধ অনেকটা কমে যাবে। আর পুলিশতো সবসময়ই রয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন প্রথম ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন আপনারা দেখেছেন পাহাড়ি এলাকায় কি অবস্থা ছিল। সেখানে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে সে সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে আভিযানিক অপারেশনের পাশাপাশি তাদেরকে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগও দেয়া হয়েছিল। এরপর থেকেই পাহাড়ি এলাকায় শান্তির সুবাতাস বইছে।
আইজিপি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে যেভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমন করা হয়েছে, তা বিশ্বব্যাপী আজ প্রশংসিত। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, কমিউনিটি পুলিশের সদস্যদের সমন্বয়ে আমরা জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস সফলভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছি।
আইজিপি আরও বলেন, দেশে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে 'পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ' মূলমন্ত্রে আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এখন প্রতিমাসে সারাদেশে প্রতি থানায় 'ওপেন হাউস ডে' পালন করা হয়। যেখানে সাধারণ মানুষ পুলিশ অফিসারদের সাথে সরাসরি কথা বলেন, তাদের সমস্যা তুলে ধরেন। এতে করে সাধারণ মানুষ থানা থেকে কেমন সেবা পাচ্ছেন, ওই এলাকায় কী ধরনের অপরাধ বেশি ঘটছে, কেন ঘটছে তা আমরা জানতে পারি। সাধারণ মানুষের পরামর্শ নিয়ে পুলিশ সেক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আইজিপি বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'আপনারা স্বাধীন দেশের পুলিশ, আপনারা জনগণের পুলিশ, আপনাদের দায়িত্ব জনগণকে সেবা করা।' বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ এখন জনগণের কাছাকাছি চলে গেছে। এতে করে সমাজে অপরাধ দমন সহজ হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সকল জেলা, রেলওয়ে, হাইওয়ে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ও মেট্রোপলিটন ইউনিটে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের চলমান কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী ৫৪ হাজার ৭১৮টি কমিটিতে ৯ লাখ ৪৭ হাজার ৭০১ জন কমিউনিটি পুলিশিং সদস্য কাজ করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মূল কাজ সম্পর্ক স্থাপন, পার্টনারশিপ। পুলিশ সমাজের মানুষকে সাথে নিয়ে সততার সাথে, স্বচ্ছতার সাথে দায়িত্ব পালন করলে সমাজে অপরাধ কমবে, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। তরুণ প্রজন্মের কাছে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের বার্তা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে আমাদের কাজ করতে হবে। কারণ তারাই ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব দিবে। অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। পুলিশ এবং জনতা মিলেই সমাজে অপরাধ দমন করতে হবে, তাহলে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ইভটিজিং, যৌতুক, মাদক ইত্যাদি সামাজিক অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজের সবাই মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সমাজের সবাইকে একসাথে বসে সামাজিক সমস্যা সমাধান করতে হবে।
অতিরিক্ত আইজিপি মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, সমাজে অপরাধ দমনে কমিউনিটি পুলিশের সদস্যদেরকে কাজে লাগাতে হবে। পুলিশের পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরা কাজ করলে সমাজে অপরাধ কমে আসবে।
অনুষ্ঠানে শ্রেষ্ঠ কমিউনিটি পুলিশিং ম্যানেজার ও সদস্যদের পুরস্কৃত করা হয়।
উল্লেখ, প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ শনিবার 'কমিউনিটি পুলিশিং ডে' উদযাপিত হয়ে আসছে।
