রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফাইল না আসায় হচ্ছে না শুনানি, বন্ধ সগিরা মোর্শেদ খুনের বিচার

  • দুটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় আসামিদের আবেদন অন্তর্ভুক্ত থাকলেও হয়নি শুনানি
  • শাখা থেকে কেন ফাইল আসল না সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত: মোতাহার হোসেন সাজু
  • বিচারকে বিলম্বিত করতেই এই কৌশল নিয়েছে আসামি পক্ষ: ডিএজি রুমি
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২২, ২৩:২৯

৩৩ বছর আগে ঢাকায় খুন হয়েছিলেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিসের গবেষক সগিরা মোর্শেদ। সেই খুনের মামলার বিচার বন্ধ ছিল ৩০ বছর। পিবিআইয়ের অধিকতর তদন্তের ভিত্তিতে দুই বছর আগে নতুন করে বিচার শুরু হয় চাঞ্চল্যকর এই খুনের। নিম্ন আদালতে সেই খুনের মামলার বিচার আবারও চার মাস ধরে বন্ধ রয়েছে দুই আসামির আবেদনে। যে আবেদনে ভিকটিম সগিরা মোর্শেদের মেয়ের সাক্ষ্যগ্রহণ বাতিলের আর্জি জানানো হয়েছে হাইকোর্টে। 

হাইকোর্টে আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার কাজ বন্ধের আর্জি দেয় আসামি পক্ষ। আবেদনের ওপর হাইকোর্টের আদেশ দাখিলের জন্য আসামি পক্ষকে সময় দেওয়া হয়েছে ট্রাইব্যুনাল থেকে। কিন্তু আসামি পক্ষ আজ অবধি হাইকোর্টের কোন আদেশ দাখিল করতে পারেনি। যদিও ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে দুই আসামির করা আবেদনটি গত চার মাসে হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চের কার্যতালিকায় শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ফৌজদারি শাখা থেকে ফাইল না আসায় হয়নি শুনানি। শুনানির সময় ফাইল না পাওয়ায় এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট। পরে আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের বিচারপতিরা। এখন আসামি পক্ষ আবেদনটি শুনানির জন্য অন্য কোন ফৌজদারি মোশন বেঞ্চে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এদিকে হাইকোর্টে আবেদন বিচারাধীন থাকায় ট্রাইব্যুনালও মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ বন্ধ রেখেছেন। আগামী ১০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে এই মামলায় আসামির আবেদনে ওপর হাইকোর্ট কি আদেশ দিয়েছে তা দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, নানাভাবে বিচারকে বিলম্বিত করতেই আসামি পক্ষ এই পদ্ধতি অবলম্বন করছেন। উনারা এক বেঞ্চ থেকে আরেক বেঞ্চে আবেদন নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু শুনানি করছেন না। কারণ আসামি পক্ষ ছোট্ট একটা গ্রাউন্ডে হাইকোর্টে এসেছে। যা আইন সমর্থন করে না। আসামিদের আবেদনের কোনো মেরিটও নাই। এই কারণে এক কোর্ট থেকে আরেক কোর্টে মামলাটি নিয়ে যাচ্ছে যাতে সময়ক্ষেপণ করে ট্রাইব্যুনালের বিচারকে বিলম্বিত করা যায়।  

এদিকে আইনজ্ঞরা বলছেন, হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সময়মত কোর্টে কেন ফাইল আসছে না, কারা এর পেছনে রয়েছে সেটা সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ এই চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার বিচার এক আসামির আবেদনে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশে ৩০ বছর বন্ধ ছিল। নিশ্চয়ই আসামি পক্ষ চাইবে না এই মামলার বিচার দ্রুত শেষ হয়ে যাক।  

প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালের ২৫ জুলাই সগিরা মোর্শেদ ভিকারুননিসা নূন স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে গিয়ে খুন হন। তখন মিন্টু নামে এক আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ডিবি পুলিশ। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের আদেশ দিলে আসামি মারুফ রেজার আবেদনে ১৯৯১ সাল থেকে হাইকোর্টের আদেশে মামলার বিচার কাজ বন্ধ ছিল ৩০ বছর। পরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১৯ সালে ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ। অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন্স (পিবিআই)।

সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন।

ওই তদন্তে সগিরা মোর্শেদের ভাসুর ডা. হাসান আলী চৌধুরী (৭০), তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা ওরফে শাহিন (৬৪), শাহিনের ভাই আনাছ মাহমুদ রেজওয়ান (৫৯) ও মারুফ রেজাকে (৫৯) অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই। এই চার আসামিই আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে ঘটনায় দায় স্বীকার করে নেন।

চার্জশিটে বলা হয়, স্বজনদের পরিকল্পনাতেই খুনের শিকার হন ওই নারী। আর সগিরা মোর্শেদকে গুলি করে খুন করেন মারুফ রেজা। ইতিমধ্যে জামিনে আছেন এই হত্যা মামলার দুই আসামি হাসান আলী ও তার স্ত্রী সায়েদাতুল মাহমুদা শাহীন।

সগিরা মোর্শেদের মেয়ের সাক্ষ্যগ্রহণের বৈধতা চ্যালেঞ্জ:

২০২০ সালের ডিসেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১। অভিযোগ গঠনের পর দশ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। রাষ্ট্রপক্ষের দশ নম্বর সাক্ষী হলেন সগিরা মোর্শেদের মেয়ে সামিয়া সারওয়াত চৌধুরী। গত জুন মাসে তার আংশিক জবানবন্দি রেকর্ড করে ট্রাইব্যুনাল। এরপরই সামিয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ না করার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদন দেয় তার চাচা ও চাচি ডা. হাসান আলী ও সায়েদাতুল মাহমুদ শাহীন। 

ডা. হাসান আলী।

আবেদনে বলা হয়, ঘটনার সময় সামিয়ার বয়স ছিল ৫ বছর। কিন্তু এখন তার বয়স ৩২ বছর। সাক্ষ্য নেওয়া হলে আসামিরা ন্যায় বিচার পাবেন না। আসামিদের এই আবেদন খারিজ করে দিয়ে ট্রাইব্যুনালের বিচারক রফিকুল ইসলাম তার আদেশে বলেন, সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী আসামিদের এই আবেদন মঞ্জুরের কোন যুক্তিসংগত কারণ নাই।

ট্রাইব্যুনালের এই আদেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৩৯ ধারা অনুযায়ী হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন মামলা করেন। ওই রিভিশনে সগিরা খুনের মামলার নথি তলবের পাশাপাশি বিচার কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়। গত ২১ জুলাই এই রিভিশন আবেদন শুনানির জন্য বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের দ্বৈত বেঞ্চের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য অন্তর্ভূক্ত হয়। ছয় কার্যদিবস মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ছিল।

আনাস মাহমুদ

কিন্তু গত ৩১ জুলাই ও ১০ আগস্ট মামলাটি শুনানির জন্য ডাকা হলেও সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে ফাইল না থাকায় শুনানি হয়নি। পরে সেখান থেকে আবেদনটি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর আবেদনটি শুনানির জন্য নেওয়া হয় বিচারপতি এসএম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি ফাহমিদা কাদেরের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চে। গত ২৩ আগস্ট ওই বেঞ্চের কার্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় আবেদনটি। পাঁচ কার্যদিবস ধরে মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ছিল। সর্বশেষ গত পহেলা নভেম্বর শুনানির জন্য ডাকা হলে ফাইল না পাওয়ায় আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেন হাইকোর্ট।

মারুফ রেজা।

আইনজীবীদের বক্তব্য

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের কৌসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কেএম মাসুদ রুমি ইত্তেফাককে বলেন, আসামি পক্ষ বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছেন যাতে উনাদের আবেদনের শুনানি না হয়। শুনানি না হলে লাভবান হচ্ছেন আসামি পক্ষ। কারণ আবেদন বিচারাধীন রয়েছে এমন যুক্তি দেখিয়ে ট্রায়াল কোর্টে যাতে মামলার বিচার না চলে সেটাই কৌশল হিসাবে নিয়েছে আসামি পক্ষ। তিনি বলেন, যেহেতু কোন কোর্টে এখন মামলাটি বিচারাধীন নাই সেহেতু মামলার বিচার কাজ চলতে আর কোনো আইনগত বাধা নাই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, শর্ষের মধ্যে যদি ভুত থাকে তাহলে কিছু করার নাই। ফৌজদারি শাখা থেকে ফাইল কেন আসবে না। এই ফাইল না আসার কারণ খুঁজে বের করতে হবে। এই ফাইল না আসার সুবিধাভোগীকে, নিশ্চয়ই আসামি পক্ষ। কারণ দিনের পর দিন মাসের পর মাস শাখা থেকে কোর্টে ফাইল আসছে না, যার কারণে শুনানি হচ্ছে না আসামিদের আবেদনের। এতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে। শুনানি ও নিষ্পত্তি না হওয়ায় ট্রাইব্যুনালে বন্ধ রয়েছে এই খুনের মামলার বিচার। এখন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের খতিয়ে দেখা উচিত কেন সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সময়মত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার ফাইল কোর্টে পৌঁছল না। কারা এর পেছনে জড়িত সেটা বের করা।

আসামি পক্ষের কৌসুলি মো. আকতারুজ্জামান বলেন, দুটি কোর্টের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য আসে। কিন্তু কার্যতালিকা থেকে বাদ দিয়ে দিয়েছে আদালত। এখন অন্য কোর্টে নিতে হবে। তবে ফাইল কেন সময়মত কোর্টে আসছে সেটা তিনি জানেন না বলেও দাবি করেন।

আইনজীবীরা বলছেন, হাইকোর্টের কোন বেঞ্চে মোশন মামলা দাখিল করার পর সেটা কার্যতালিকায় আসে তখন সেই মামলার ফাইল কোর্টের হেফাজতে চলে যায়। এরপর সেটার কোর্ট থেকে সংশ্লিষ্ট শাখায় চলে যায়। এরপর সেই মামলা শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসলে ফাইল সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে কোর্টে পাঠানোর দায়িত্ব শাখার তত্ত্বাবধায়কের। 

ইত্তেফাক/এএএম