শুক্রবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২২, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ফুরিয়ে যাচ্ছে ওষুধ ও খাদ্য সরবরাহ

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২২, ০৩:০২

পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিয়ে স্বাস্থ্য প্রশাসন যেন পাগলামি করছে। আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে খাবার কেনা বন্ধ। জোড়াতালি দিয়ে কর্তৃপক্ষ রোগীদের খাবার সরবরাহ করছিল। আর্থিক সংকটে সেটিও চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দুই-এক দিনের মধ্যে রাগীরা পড়তে যাচ্ছেন খাদ্য ও ওষুধ সংকটে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য বিভাগের নির্দেশনা কামনা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বারবার চিঠি পাঠালেও সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য প্রশাসন উদাসীন।

বিষয়টি নিয়ে বারবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে জানিয়েছিল। কিন্তু প্রতিকার মেলেনি। সরকারি প্রত্যেকটি হাসপাতাল দেখার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগ আছে। কিন্তু এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কারণে মাঠ পর্যায়ের হাসপাতালের করুণ অবস্থা। তার দৃষ্টান্ত প্রমাণ পাবনা মানসিক হাসপাতাল।

এমন নয় যে, অনেক দামি খাবার দেওয়া হয় রোগীদের। খাবারের পেছনে রোগীদের প্রতিদিনের বরাদ্দ মাত্র ১২৫ টাকা। এটি ২০১৩ সালের বাজেট। কিন্তু ৯ বছরেও সে বাজেট বাড়েনি।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, পাবনা মানসিক হাসপাতালের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না। এই সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য প্রশাসনের দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দিয়েছেন। যখন যা প্রয়োজন তা বাস্তবায়নের নির্দেশনাও দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবায়নে বড় বাধা ওই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। অধিদপ্তরে গেলে স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাত্তা দেওয়া হয় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে অধিদপ্তরে আফজালের মতো কেরানি ও মালেকের মতো ড্রাইভার কোটি কোটি টাকার মালিক, সেখানে তো দুর্নীতি ছাড়া কিছুই হবে না—এটাই স্বাভাবিক। এ কারণে তৃণমূল থেকে দরখাস্ত এলেও জবাব মেলে না।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল মানসিক রোগের দেশের বিশেষায়িত হাসপাতাল। এই হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত ৩১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন চিকিৎসক। প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ৩৮ জনের মধ্যে শূন্য ২৪। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ শূন্য। ব্যাহত হচ্ছে রোগীদের চিকিৎসাসেবা। তার ওপর নতুন করে সংকটের সৃষ্টি হয়েছে রোগীর ওষুধ ও খাবারের।   

৫০০ শয্যার পাবনা মানসিক হাসপাতালে সারা দেশ থেকেই রোগী আসে। গতকাল চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৯৪ জন রোগী। ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালের পথ্যসহ বিভিন্ন দ্রব্য ক্রয়ের জন্য ২০২১ সালের ২৪ মে মানসিক হাসপাতালের পরিচালক দরপত্র আহ্বান করেন। খাদ্য ও মালামাল সরবরাহকারী একটি সংক্ষুব্ধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাবনা মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বনিবনা হচ্ছিল না। এ অবস্থায় তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়। গত বছরের ১৪ জুন রোগীদের খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে খাদ্যতালিকার নাম উল্লেখ করার জটিলতা নিয়ে পাবনা দায়রা জজ আদালতে মামলা করে। আদালত ঐ বছরের ২৯ জুন সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিবাদী অর্থাৎ মানসিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এতে ঠিকাদার নির্বাচন ও নিয়োগ তথা দরপত্র কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। আদালতের আদেশের পর নিরুপায় কর্তৃপক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে বাকিতে রোগীদের খাবার কেনার চেষ্টা করে। এতে বকেয়া পড়ে প্রায় ৩৮ লাখ টাকা। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে বারবার জানিয়ে কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর থেকে রোগী ভর্তি বন্ধ ও ভর্তি থাকা রোগীদের বাড়িতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যদিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। তবে রোগীদের খাবারের সেই বকেয়া টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় এখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঠিকাদার সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে আরো দুই-তিন মাস লাগবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আদালতে বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পথ্য ক্রয়ে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ভর্তিকৃত রোগীদের খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ নিয়ে বিপাকে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, রোগীদের ওষুধ ও খাদ্য সংকটের বিষয়টি অবশ্যই দেখব।  

এ ব্যাপারে পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাফকাত ওয়াহিদ জানান, রোগীদের ওষুধ ও খাবার সরবরাহ নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, আশা করি অচিরেই সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

১৯৫৭ সালে পাবনার সাবেক সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাঙ্গুলি ‘শীতলাই হাউজ’ নামক জমিদার বাড়িতে অস্থায়ীভাবে মানসিক হাসপাতাল স্থাপন করেন। ১৯৫৯ সালে জেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে হেমায়েতপুরে ১১২ দশমিক ২৫ একরের একটি চত্বরে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শয্যা সংখ্যা ছিল ৬০।

 

 

ইত্তেফাক/ইআ