আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আমরা আপনাদের সমাবেশে বাধা দিচ্ছি না। কিন্তু সমাবেশের নামে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর হস্তে দমন করবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগও বসে থাকবে না। আপনাদের সঙ্গে খেলা হবে, মোকাবিলা হবে, ফাইনাল খেলা হবে ডিসেম্বরে, রাজপথে। তিনি বলেন, খেলা হবে। খেলা হবে আন্দোলনে, নির্বাচনে, ভোট চুরির বিরুদ্ধে, ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যারা ১৭ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, ভুয়া ভোটার বানানোর বিরুদ্ধে খেলা হবে।
গতকাল শনিবার কুমিল্লা টাউন হল মাঠে মহানগর আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ওবায়দুল কাদের এসব কথা বলেন।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, বিএনপি এক মহাদুর্যোগের নাম। এই অপশক্তির হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। টেমস নদীর ওপার থেকে ফরমায়েশ আসে, বিএনপির নেতাকর্মীরা খোয়াব দেখছেন। তাদের রঙিন খোয়াব, যা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। তিনি বলেন, দণ্ড মাথায় নিয়ে রাজনীতি করবেন না। কোনো দণ্ডিত নেতাকে দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
তিনি আরো বলেন, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে আবারও ভোট চুরি করবে, খুন করবে। গণতন্ত্র হরণ করবে। যতই নাচানাচি করেন, লাফালাফি করেন—বিএনপির সঙ্গে জনগণ নেই। দুবাই থেকে টাকা আসে, খোঁজ পেয়েছি। ব্যবস্থা হবে। আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ থাকলে, তারা যত চ্যাঁচামেচিই করুক, যত সমাবেশ করুক, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারবে না। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ বিজয়ী হবে।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বরিশালে সমাবেশের চার দিন আগে থেকে হাঁড়িপাতিল নিয়ে জড়ো হচ্ছেন। রংপুরে দুই দিন আগে বিছানা-বালিশ নিয়েও লোক সমাগম করতে পারেননি। টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা লোক এনে বরিশালে জনসমাবেশ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, আপনাদের (বিএনপি) দেশবিরোধী সকল অপশক্তির মোকাবিলা করা হবে। যারা মা-বোনের বুক খালি করেছেন তাদের মোকাবিলা করা হবে। যারা আগুন সন্ত্রাস করেছেন তাদের মোকাবিলা করা হবে। কোনো অপশক্তির কাছে আওয়ামী লীগ মাথা নোয়াবে না। লাঠির আগায় জাতীয় পতাকা বেঁধে আন্দোলনের নামে লাল-সবুজের পতাকার অবমাননা করেন। এই পতাকার অবমাননা দেশের মানুষ মেনে নেবে না।
১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে মোস্তাক-জিয়ার মতো মীর জাফররা ছিল। পাকিস্তানিরা যাকে ফাঁসি দিতে গিয়েও ফাঁসি দিতে পারেনি সেখানে বাংলাদেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধুকে খুন করে খুনিদের দায়মুক্তি দিতে জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনী এনে সংবিধানকে কলঙ্কিত করেছে। ১৫ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড সেনাপতি জিয়াউর রহমান—আপনি খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন, বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন, আপনাকেও সঙ্গে সঙ্গে পুরস্কৃত করেছে খন্দকার মোস্তাক। হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান জবানবন্দিতে বলেছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড তারেক রহমান। সেদিন আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতাকর্মী মারা গেছেন। ঐদিন শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন বলেই আমরা বেঁচে আছি।
কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহারের সভাপতিত্বে সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম। প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। এতে অন্য অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুস সবুর প্রমুখ। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র আরফানুল হক রিফাত।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, খালেদা জিয়া নাকি নারী মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তো পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন! তারা (বিএনপি) বলেছে, বাংলাদেশ নাকি শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে। বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হবে কেন? শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আমরা নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু করেছি। দেশের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ২ শতাংশ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বমন্দা দেখা দিলেও অনেক দেশের চাইতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য এমন কোনো অপকর্ম নেই যা তারা করে নাই। আওয়ামী লীগ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে এমন কোনো শক্তি নাই আওয়ামী লীগকে পরাজিত করতে পারে।
মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন বিএনপি-জামায়াত দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করছে। বিএনপির পলাতক নেতা তারেক রহমান একটা ডায়লগ দিয়েছেন ‘টেক ব্যাক বাংলাদেশ’। তারা বাংলাদেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা মানেই তাদের পরাজয়। তাদের সময়ে ৫০-৬০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। রিলিফ নিতে হতো, ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে দেশের পরিচয় ছিল। আজকে আমরা ভিক্ষুকের জাতি নই, আমরা স্বাবলম্বী। তাদের সময়ে ৩১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। বিদ্যুৎ আসলে মানুষ বলত খালেদা আসছে। এখন বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ২৬ হাজার মেগাওয়াট। বিএনপি-জামায়াত দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র বানিয়েছিল, হাওয়া ভবনের নামে কমিশন বাণিজ্য চালিয়েছিল। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুল বলছেন— সরকার সকল রিজার্ভ খেয়ে ফেলেছে। বিশ্বমন্দার কারণে জনগণের পেছনে ব্যয় করায় এখন রিজার্ভ ৩৯ বিলিয়ন। আপনারা গণতন্ত্র, দুর্নীতি ও উন্নয়নের কথা বলেন, তা আপনাদের মুখে মানায় না।
সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কাউন্সিলরদের সর্বসম্মতিক্রমে দ্বিতীয় বারের মতো সদর আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দীন বাহারকে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আরফানুল হক রিফাতকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
সম্মেলনস্থলে সুশৃঙ্খলভাবে ও সুন্দর পরিবেশে কার্যক্রম পরিচালিত হলেও দুপুরের দিকে বাইরে কিছুসংখ্যক নেতাকর্মীর মধ্যে হট্টগোল ও ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনার সৃষ্টি হলে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় বেশ কয়েকটি পটকা ও ককটেল বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায়।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান জানান, সম্মেলনকে ঘিরে পুলিশ তৎপর ছিল। এতে বড় ধরনের কোনো সংঘাত কিংবা সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি।
