রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঘরে ঘরে ডেঙ্গু, প্লাটিলেটের জন্য হাহাকার

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২২, ১৭:০৬

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওর্য়াডের বারান্দায় দেয়ালে অসহায়ভাবে মোবাইল ফোন দিয়ে রক্তের জন্য নানা জনের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন যাত্রাবাড়ীর রহিম শিকদার। তার ছয় বছরের মেয়ে শিশু জান্নাতের দুইদিন ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে যাচ্ছে। তাই রক্ত প্রয়োজন। কিন্তু দু্ইদিন ধরে আত্বীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাঙ্কে কোথাও ‘বি’ পজেটিভ রক্ত পাচ্ছেন না।

এ চিত্র কেবল রহিম শিকদার বা তার সন্তানের নয়, এমন শত চিত্র রাজধানীজুড়ে। এ বছর ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। অন্যান্য বছর অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমতে থাকে। তবে এবার দেশজুড়ে দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গুর বিপরীত চিত্র। এখন শহর থেকে গ্রাম সবখানেই এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। আক্রান্তের পাশাপাশি প্রতিদিন বাড়ছে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যাও।

হাসপাতালের বাড়ান্দায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীরা। ছবি: ইত্তেফাক

রাজধানীর অনকে হাসপাতালেই শয্যা ফাঁকা নেই । ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মধ্যে অনেকেরই চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হচ্ছে রক্ত। ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তে প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা কমে যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে আক্রান্ত হওয়ার ৩য় বা ৪র্থ দিন হতে কমতে থাকে রোগীর প্লাটিলেট। হঠাৎ করেই নেমে আসছে ২০-৩০ হাজারের নিচে। ২০ হাজারের নিচে প্লাটিলেটের সংখ্যা নেমে এলে কোনপ্রকার আঘাত ছাড়াই রক্তক্ষরণ হতে পারে রোগীর। এতে অনকে সময় রোগী মারা যায় ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে।

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত জন্য প্লাটিলেট সংগ্রহ করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যক্ষ ডা. বশির আহমেদ ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘চলতি বছর ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে তিনটি ধরণ (স্টেইন-১, ৩, ৪) রোগের প্রকোপ বাড়িয়েছে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেওয়ায় আক্রান্তদের শক সিন্ড্রোম অর্থাৎ হঠাৎ শরীর নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, হেমোরেজিক ফিবার বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে বাড়ছে মৃত্যু। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মধ্যে ৬৪ শতাংশ ডেঙ্গু রোগী মারা যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে কোনো জ্বর হলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা নিতে হবে। কোনভাবেই কোনো জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে ডেঙ্গুতে মৃত্যু কমানো সম্ভব।’

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের জন্য রক্ত দাণ করছে স্বজনরা। ছবি: ইত্তেফাক

ডেঙ্গু আক্রান্তদের রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়া রোগীদের জন্য ব্যক্তিপর্যায় বিশেষ করে বন্ধু, স্বজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী ও বিভিন্ন স্বেচ্ছা-সংগঠনের কাছ থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে এবং ব্লাড ব্যাংকগুলোতে রক্তের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে দেশে কয়েক মাস ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যার বাড়ার কারণে প্রয়োজনের সময়ে রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না ব্যক্তিপর্যায়ে বা ব্লাড ব্যাংকগুলোতে।

ব্যক্তিপর্যায়ে বা স্বেচ্ছায় যারা নিয়মিত রক্ত দেন তাদের একজন শফিকুল ইসলাম বাবু। তিনি ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমিসহ বন্ধুরা স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্ত দেই। বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চাইলেও রক্ত দিতে পারছি না। আমি গেলো সপ্তাহে একজনকে রক্ত দিয়েছি। আমাদের সব বন্ধুদের স্বেচ্ছায় রক্ত দেওয়া শেষ হয়ে গেছে গত মাসে। তাই চাইলেও আমরা এখন কাউকে রক্ত দিতে পারছি না।’

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তকে প্লাটিলেট দেওয়া হচ্ছে। ছবি: ইত্তেফাক

রক্ত যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী রক্ত দিতে পারছেন না তারা। ৩ মাস ধরে ব্লাড ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকদের চাপ বেড়েছে দুই থেকে তিনগুণ। দিনে ৫০ জনের বেশি ডেঙ্গু রোগীর জন্য রক্ত চাচ্ছেন গ্রাহকরা। গ্রাহকদের ১০০ জনের ৭০ জনই ডেঙ্গু রোগীর জন্য রক্ত খুঁজছেন। রক্ত গ্রহীতাদের চাহিদা অনুযায়ী রক্তদাতা পাচ্ছে না ব্লাড ব্যাংকগুলো। অনেক গ্রহীতা রক্ত না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

পান্থপথ আলিফ ব্লাড ব্যাংক অ্যান্ড ট্রান্সফিউসন সেন্টারের সিনিয়র মেডিকেল টেকনোলজিস্ট জাহাঙ্গীর বলেন, ‘রক্তের জন্য ডোনার ম্যানেজ করতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ত্রেতাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। অনেকই আমাদের কাছে এসে ফিরে যাচ্ছেন, কারণ আমাদের কাছে এতো রক্ত নেই। আমাদের এখানে রক্তের গ্রুপভেদে প্ল্যাটিলেট দাম ১৮০০-৭০০০ হাজার টাকা।’

প্লাটিলেট বা অণুচক্রিকা।

রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকের ইনচার্জ এস আই এ কে এম সিদ্দিকুল ইসলাম ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের ব্লাড ব্যাংকে আগে যারা ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগীদের জন্য যে প্ল্যাটিলেট প্রয়োজন হতো, তখন মাসে ৫০-৬০ ব্যাগের একটা চাহিদা থাকতো। কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গুর বিস্তার বেড়ে যাওযায় গেলো মাসে প্রায় ৪০০ ব্যাগ প্ল্যাটিলেট আমরা বিতরণ করেছি। এর ধারাবাহিকতায় প্রতিদিন প্ল্যাটিলেটের চাহিদা বাড়ছে। এতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

ইতোমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ মোট ৫০টি জেলায় ডেঙ্গু দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গু এখন আশঙ্কাজনক হারে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে চিকিৎসারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রয়েছে। হাসপাতালে শয্যার অভাব হবে না। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত বেডের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজন হলে আরও বাড়ানো হবে। তবে শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আরও জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকেও আরও সচেতন হতে হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

শনিবার (৫ নভেম্বর) সারাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু বিষয়ক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৬৭ জন। পাশাপাশি চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ১৯৯ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৮ হাজার ২৯৫ জন।

ইত্তেফাক/এনএ/এসসি