দুনিয়া জুড়ে টাকা নিয়ে তেলেসমাতি কম হয় না! কারো জীবনে টাকা না চাইতেই আসে। যেন ‘আলাদিনের জাদুর চেরাগ’ রয়েছে তার কাছে। শুধু ঘষা দেওয়ার অপেক্ষা। আবার অনেকে টাকা উপার্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে ব্যর্থ। তারা ভাবে ইশ! থাকতো যদি একটা টাকার গাছ, তবে কোনো দুঃখই থাকতো না। সেই দুঃখ নিয়ে গান হয় ‘টাকা তুমি সময় মতো আইলা না’। আবার, শুধু টাকা হলেই চলে না। সেই টাকা যদি পরিকল্পনা মতো, হিসাব মতো খরচ করা এবং খরচ বুঝে আয় করা না যায় তবে একদিন রাজার ভান্ডারও ফুরোতে সময় লাগে না। এটা যখন মানুষ বুঝল তখনই এলো বাজেট। কিভাবে কোথা থেকে টাকা আসবে আর কোন খাতে কত টাকা খরচ হবে তার একটা হিসাব আগেভাগে করা থাকলে আর ‘ভাঁড়ারে টান’ পড়বে না। তাই তিন সদস্যের পরিবারের যেমন একটা দৈনিক, মাসিক ও বছরের বাজেট থাকে তেমনি বাজেট থাকে, অফিসে, ব্যবসায়। বাজেট থাকে শহরের এবং দেশের।
সরকারের বাজেট প্রণয়নের ওপরে দেশে-বিদেশে সব মহলের তীক্ষ্ম নজর থাকে। সাধারণ মানুষের মূল আগ্রহ থাকে জাতীয় বাজেটে নতুন কী থাকছে, দাম বাড়ছে কোন কোন পণ্যের আর দাম কমবেই বা কোন পণ্যের। সাধারণ মানুষের কাছে বাজেট অংকের হিসাবে কত বড় হলো সেদিকে যতটা না মনোযোগ পায় তার চেয়ে বেশি মনোযোগ থাকে বাজার দরের ওপর। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই বাজেট ঘোষণার কাল এক মোক্ষম সময় প্রতিপক্ষকে আক্রমণের। সরকারি দল বলে উন্নয়নের বাজেট, বিরোধী দল বলে গরিব মারার বাজেট। আর ব্যবসায়ীরা দেখে কোন খাতে করের চাপ কমছে আর কোথায় কোথায় সরকার বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছে। তা সে যাই হোক না, গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ করা হয়েছে আগামী অর্থবছরের বাজেট। নতুন সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট। বাজেট নিয়ে তাই বরাবরের মতো আলোচনা সর্বত্র। যদিও অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল অসুস্থ বোধ করায় তার পরিবর্তে বাজেটের অনেকটা অংশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থাপন করেন।
বাজেটের শুরু: বাজেট শব্দটি এলো কোথা থেকে? বাজেট একটি ইংরেজি শব্দ যা বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন নথিপত্রে ব্যবহূত হয় বাজেট হিসেবেই। মানে বাজেটের তেমন লাগসই কোনো বাংলা শব্দ খুঁজে পাওয়া যায়নি। এই বাজেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘বোওগেট’ থেকে। যার অর্থ চামড়ার ব্যাগ। জানা যায়, ১৭২০ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে প্রথম জাতীয় বাজেট ও রাজস্ব নীতি উত্থাপন করেন স্যার রবার্ট ওয়ালপোল। এর ঠিক ১৩ বছর পর ওয়ালপোল সরকারের করের বোঝা কমাতে তার রাজস্ব পরিকল্পনায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য যেমন ওয়াইন, তামাক প্রভৃতির ওপর আবগারি শুল্ক ধার্য করার প্রস্তাব করেন। এতে সাধারণ জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে যে ‘উইগ পিয়ার উইলিয়াম দ্য বাজেট ওপেন অর অ্যান আনসার টু এ প্যামফলেট’ নামে একটি পুস্তিকা লিখে ফেলেন। সেবারই প্রথম সরকারের রাজস্ব নীতিতে বাজেট শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু, বাজেটের আনুষ্ঠানিক রূপ পায় ১৭৬০ সালে।
বাংলাদেশের বাজেট: স্বাধীন দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রথম বাজেট উপস্থাপন করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের ৩০ জুন একই সঙ্গে ১৯৭১-৭২ ও ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। তাজউদ্দীন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন; সেই বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। আর এবছর নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল দেশের ৪৮তম বাজেট উপস্থাপন করলেন। বর্তমান অর্থমন্ত্রীর নতুন অর্থবছরের বাজেট ৫ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
বাংলাদেশের বাজেট উপস্থাপনে তাজউদ্দীন আহমদ অনন্য এক অবস্থানে রয়েছেন। তিনিই একমাত্র পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদ যিনি সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী মোট ১২ জন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেছেন আর ১৩তম ব্যক্তি হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামাল গত বৃহস্পতিবার বাজেট পেশ করলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ছাড়া বাকিরা ছিলেন হয় অবসরপ্রাপ্ত আমলা, অথবা অর্থনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী। কেউই পূর্ণ রাজনীতিবিদ নন।
বাজেট উপস্থাপনের চালচিত্র: এক অর্থবছরে দুবার বাজেট উপস্থাপনের উদাহরণও আছে আমাদের। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। এর পরে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নিয়ে মূল আর্থিক কাঠামো ঠিক রেখে নতুন করে বাজেট উপস্থাপন করেন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। আর সংসদে সমান ১২ বার বাজেট পেশ করে রেকর্ড করেছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান এবং আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে টানা দশবার বাজেট দিয়ে আবুল মাল আবদুল মুহিত রেকর্ড গড়েছেন। মুহিত শেখ হাসিনার সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে টানা ১০টিসহ মোট ১২টি বাজেট পেশ করেছেন। এর আগে তিনি এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৮২-৮৩ ও ১৯৮৩-৮৪ এই দুই অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন।
তাজউদ্দীন আহমদ তিনটি, এএমএস কিবরিয়া ছয়টি, এম সাইদুজ্জামান চারটি বাজেট দেন। অর্থ-উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম দুটি এবং ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ একটি বাজেট পেশ করেন। এরশাদ সরকারের দুই অর্থমন্ত্রী এমএ মুনিম দুটি এবং ড. ওয়াহিদুল হক একটি বাজেট উপস্থাপন করেন। বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে ড. মীর্জা নুরুল হুদা একটি বাজেট দেন। খন্দকার মোশতাক সরকারের আমলে দেশের প্রথম টেকনোক্র্যাট অর্থমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরের বাজেট দেন ডক্টর এ আর মল্লিক।
বাজেট যে শুধু অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা দিয়েছেন তা কিন্তু নয়। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সামরিক শাসক হিসেবে তিনটি বাজেট উপস্থাপন করেন।
দেশভেদে বাজেট পেশের সময় ভিন্ন। বাংলাদেশে যেমন জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ, সাধারণত জুন মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার। এবছর তা ঈদের ছুটির কারণে বদলে গেছে।
বিভিন্ন দেশের অর্থবছর: দেশভেদে বাজেট পেশের সময় ভিন্ন। পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশের অর্থবছর শুরু পহেলা জুলাই, শেষ ৩০ জুন। চীন, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্পেনে অর্থবছর শুরু হয় পহেলা জানুয়ারি আর শেষ হয় ৩০ ডিসেম্বর। ভারত, ইংল্যান্ড, হংকং, কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় অর্থবছর শুরু হয় পহেলা এপ্রিল, শেষ হয় ৩১ মার্চ। যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডে অর্থবছর শুরু হয় পহেলা অক্টোবর, শেষ হয় ৩০ সেপ্টেম্বর।
আরো পড়ুন: চীনে ভয়াবহ বন্যায় ৬১ জনের প্রাণহানি, ঘরছাড়া সাড়ে ৩ লাখ
ইংরেজ আমলে বাজেট: ১৮৫৭ সালে সারা ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে আর তখনই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ব্যবস্থা রদ হয়। ভারতের শাসনভার চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পাস হয় ‘ভারত শাসন আইন’। রানির হয়ে ভারতের শাসনভার দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাইসরয়কে। ভাইসরয়কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য তৈরি হয় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল। তারই অর্থসংক্রান্ত বিষয় দেখাশোনা করতেন জেমস উইলসন। ১৮৬০ সালের ৭ এপ্রিল জেমস উইলসন কলকাতায় ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতা দেন এবং ১৮৬০-৬১ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। এই উপমহাদেশে উইলসনই প্রথম ওয়েস্ট মিনিস্টার টাইপের সরকার পদ্ধতির আওতায় সরকারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনার বাজেট পেশ করেন, যা আজও বিদ্যমান বাংলাদেশ এবং ভারতে। সম্রাট আকবর প্রবর্তিত ফসলি সনের আদলে তখন এপ্রিল-মার্চকে অর্থবছর নির্ধারণ করা হয়। তিনিই প্রথম বাজেটে আধুনিক আয়কর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এর আগে এ দেশে বিভিন্ন প্রকার কর বা খাজনা প্রকৃতির রাজস্ব আয়ের ব্যবস্থা ছিলো।
পাকিস্তান জমানায় বাজেট: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এ দেশের প্রথম বাজেট মুসলিম লীগ সরকার উপস্থাপন করে। সে সময় অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হত। যদিও পরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার জুলাই-জুন অর্থবছর ঘোষণা করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ পূর্ববাংলা প্রদেশে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসে জগন্নাথ হলের হলঘরে। এ ভবনটি ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর ধসে যায়। ১৯৪৮-৪৯ সালের প্রথম বাজেট পেশ করেন হামিদুল হক চৌধুরী।
ইত্তেফাক/আরকেজি
