চুরি দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে কথায় আছে, ‘চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা’। চুরি মানে, না-বলে অন্যের জিনিস নেওয়া। অন্যভাবে বলতে গেলে চৌর্যবৃত্তি যার পেশা, সে পেশাদার চোর। আরেকটু বিস্তৃতভাবে বলতে গেলে চুরি মানে হচ্ছে, ছলে-বলে-কৌশলে মালিকের বা তত্ত্বাবধায়কের অজ্ঞাতে অথবা ব্যক্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে দ্রব্য গ্রহণ, ব্যবহার, বিক্রয়, বিলোপ, লোপাট, কুক্ষিগত, বেদখল করা বা অনধিকার নিয়ন্ত্রণ। যেসব চোর চুরিকে জীবন ধারণের উপায় হিসেবে গ্রহণ করে, তাদের পেশাদার চোর বলা হয়।
তবে এখন চুরি করা অনেকের পেশাই শুধু নয়, নেশাও বটে। সমাজে অনেক ধনী বা সামর্থ্যবান মানুষ রয়েছেন, যাদের মধ্যে চুরি করার অদম্য নেশা রয়েছে। তারা চুরিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিরা সাধারণত বড় বড় চুরি করেন। তারা পুকুর চুরি বা সাগর-মহাসাগর চুরি করে তা হজম করার বিদ্যার্জন করেছেন। এসব অভিজাত চোর ও বড় বড় চুরি নিয়ে রাষ্ট্র খুব একটা মাথা ঘামায় না। সাধারণ মানুষও না।
আমাদের সমাজে যেসব চোর রয়েছে, তাদের মধ্যে গরু চোরকে খুব খারাপ চোখে দেখা হয়। কারণ কৃষকের বেঁচে থাকার মূল অবলম্বনই হচ্ছে গরু। সেই গরু যারা চুরি করে, তাদের সমাজ ভালোভাবে দেখে না। একসময় বিশেষ দক্ষতাপ্রাপ্ত চোরই কেবল গরু চুরির সঙ্গে যুক্ত থাকত। কালের বিবর্তনে গরু চোরদের পরিচয়ও বদলেছে। এখন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও দিব্যি গরু চোর হিসেবে খ্যাতি অর্জন করছেন।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরু পাচার মামলায় গ্রেফতার হয়ে জেলে রয়েছেন বীরভূম জেলার তৃণমূল কংগ্রেসের দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী নেতা অনুব্রত মণ্ডল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অনেক তোলপাড় হচ্ছে। গরু পাচারের সঙ্গে অনুব্রত সরাসরি যুক্ত বলে সেখানকার গোয়েন্দারা অভিযোগ তুলেছে। গোয়েন্দাদের দাবি, অনুব্রত ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা হাজারো গরু পশ্চিমবঙ্গ থেকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাচার করেছে।
শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, বাংলাদেশেও গরু চুরির মামলায় সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছেন ছাত্রলীগের নেত্রী বাবলী আক্তার। তিনি ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রলীগের ছাত্রীবিষয়ক সম্পাদক। ছাত্রলীগ নেত্রীর গরু চুরির মামলায় গ্রেফতার হওয়াটা আমাদের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। গরু বা গরু চুরি যে তুচ্ছ নয়, একজন নেতা বা নেত্রী যে নানা কাজে ব্যাপ্ত থাকতে পারেন, নানাভাবে আয়-উপার্জন করতে পারেন, সেটা তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন।
গরু চোররা আমাদের চারপাশে থাকলেও তাদের সম্পর্কে যেমন আমরা বিস্তারিত জানি না, ঠিক তেমনি, গরু আমাদের অতিপরিচিত প্রাণী হলেও তার সম্পর্কেও আমরা খুব একটা জানি না। আমরা কি জানি, গরুর মুখে ওপরের পাটিতে দাঁত থাকে না? শুধু নিচের পাটিতেই থাকে। ওপরের পাটিতে দাঁত না থাকলে আমাদের পক্ষে চিবিয়ে কোনো খাবার খাওয়া সম্ভব হতো না। তা হলে গরু চিবায় কী করে? গরুর মুখে ওপরের পাটিতে দাঁত না থাকলেও থাকে শক্ত মাড়ি। যাকে ডেন্টাল প্যাড বলে। এটাই দাঁতের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। নিচের পাটির দাঁত আর এই ডেন্টাল প্যাড দিয়েই গরু খাবার চিবায়। গরুর পাকস্থলীতে চারটি ভাগ থাকে, ভাগগুলো হলো : রুমেন, রেটিকুলাম, ওমাজাম, এবওমাজাম। এজন্য গরুকে কম্পাউন্ড স্টমাক অ্যানিমেল বলা হয়। গরুর পাকস্থলীর এমন গঠনের কারণে গরু কখনো বমি করতে পারে না।
গরু প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ৫০ গ্যালন পানি পান করতে পারে। মানে পুরো এক বাথটাব পানি। আর লালাও উৎপন্ন করে প্রায় ২০ গ্যালন। গরুকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠানো যায় ঠিক; কিন্তু কখনো সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানো যায় না। গরু দিনের ছয়-সাত ঘণ্টা খাবার খেয়ে ও প্রায় আট ঘণ্টা সেই খাবার জাবর কেটে কাটায়। গরু দিনের ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা শুয়েই কাটিয়ে দেয়। দৈনিক চার ঘণ্টা ঘুমায়। প্রতিটি গরু দিনে প্রায় ৩৫ গ্যালন পানি খেতে পারে। যখন একটি গরু খাবার খায়, সেটি পেটে হজম হওয়ার পর গরুটি দৈনিক ২৫০ থেকে ৫০০ লিটার পর্যন্ত মিথেন গ্যাস উত্পন্ন করে। গরুর গন্ধশক্তি প্রবল। প্রায় ছয় মাইল দূর থেকে কোনো কিছুর গন্ধ পেতে পারে একটি গরু।
গরু কেবল লাথি কিংবা গুঁতোই দেয় না; বরং দুধ দেয়, মাংসও দেয়। আরো অনেক কিছুই দেয়। গোমূত্র জমিকে উর্বর করে। কোনো কোনো দেশে তা পবিত্রতার প্রতীক। ওষুধ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। যদিও গোমূত্র বা গোচোনা অনেক ‘বিধ্বংসী’ ক্ষমতার অধিকারী। কথায় আছে, ‘সোয়া মণ দুধ নষ্ট করে এক ফোঁটা গোচোনা।’ এর মর্মার্থ হলো, সোয়া এক মণ দুধের মধ্যে এক ফোঁটা চোনা, মানে গরুর এক ফোঁটা মূত্র পড়লে তা নষ্ট হয়ে যায়, খাওয়ার উপযুক্ত থাকে না।
আমাদের জীবনযাত্রা অর্থনীতির সঙ্গে গরুর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। ছোটবেলায় গরু নিয়ে রচনা লেখেনি এমন মানুষ নেই বললেই চলে। বাবা-মা কিংবা শিক্ষক-অভিভাবক-প্রেয়সীর কাছে গরু সম্বোধন শোনেনি—এমন হতভাগ্য বাঙালিও বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মানুষের যে রকম কূটবুদ্ধি আছে, গরুর তা নেই। এই বুদ্ধির জোরেই মানুষ গরু চুরি করে। কিন্তু গরু মানুষ চুরি করতে পারে না। সে বড়জোর মানুষকে সামান্য লাথি-গুঁতো দিতে পারে। সুসাহিত্যিক সুকুমার রায় ‘গরুর বুদ্ধি’ নামে একটা বিখ্যাত গল্প লিখেছিলেন। প্রাসঙ্গিক এই গল্পটি উল্লেখ করা যাক।
পণ্ডিতমশাই ভট্চার্যি বামুন, সাদাসিধে শান্তশিষ্ট নিরীহ মানুষ। বাড়িতে তার সরষের তেলের দরকার পড়েছে, তাই তিনি কলুর বাড়ি গেছেন তেল কিনতে।
কলুর ঘরে মস্ত ঘানি, একটা গরু গম্ভীর হয়ে সেই ঘানি ঠেলছে, তার গলায় ঘণ্টা বাঁধা। গরুটা চলছে চলছে আর ঘানিটা ঘুরছে, আর সরষে পিষে তা থেকে তেল বেরোচ্ছে। আর গলার ঘণ্টাটা টুংটাং টুংটাং করে বাজছে।
পণ্ডিতমশাই রোজই আসেন, রোজই দেখেন, কিন্তু আজ তার হঠাৎ ভারি আশ্চর্য বোধ হলো। তিনি চোখমুখ গোল করে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তাই তো! এটা তো ভারি চমৎকার ব্যাপার!
কলুকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ওহে কলুর পো, ও জিনিসটা কী হে?’ কলু বলল, ‘আজ্ঞে ওটা ঘানিগাছ, ওতে তেল হয়।’ পণ্ডিত মশাই ভাবলেন, এটা কী রকম হলো? আমগাছে আম হয়, জামগাছে জাম হয়, আর ঘানিগাছের বেলায় তেল হয় মানে কী? কলুকে আবার জিগ্যেস করলেন, ‘ঘানিতে ফল হয় না?’ কলু বললে, ‘সে আবার কী?’
পণ্ডিতমশাই টিকিতে হাত বুলিয়ে ভাবতে লাগলেন, তার প্রশ্নটা বোধহয় ঠিক হয়নি। কিন্তু কোথায় যে ভুল হয়েছে, সেটা তিনি ভেবে উঠতে পারলেন না। তাই খানিকক্ষণ চুপ করে তারপর বললেন, ‘তেল কী করে হয়?’ কলু বলল, ‘ঐখেনে সরষে দেয় আর গরুতে ঘানি ঠেলে আর ঘানির চাপে তেল বেরোয়।’ এইবারে পণ্ডিতমশাই খুব খুশি হয়ে ঘাড় নেড়ে টিকি দুলিয়ে বললেন, ‘ও বুঝেছি! তৈল নিষ্পেষণ যন্ত্র!’
তারপর কলুর কাছ থেকে তেল নিয়ে পণ্ডিতমশাই বাড়ি ফিরতে যাবেন, এমন সময় হঠাত্ তার মনে আরো একটা খট্কা লাগল—‘গরুর গলায় ঘণ্টা কেন?’ তিনি বললেন, ‘ও কলুর পো, সবি তো বুঝলুম, কিন্তু গরুর গলায় ঘণ্টা দেবার অর্থ কী? ওতে কি তেল ঝাড়াবার সুবিধা হয়?’
কলু বলল, ‘সব সময় তো আর গরুটার ওপরে চোখ রাখতে পারি নে, তাই ঘণ্টাটা বেঁধে রেখেছি। ওটা যতক্ষণ বাজে, ততক্ষণ বুঝতে পারি যে গরুটা চলছে। থামলেই ঘণ্টার আওয়াজ বন্ধ হয়, আমিও টের পেয়ে তাড়া লাগাই।’
পণ্ডিতমশাই এমন অদ্ভুত ব্যাপার আর দেখেননি; তিনি বাড়ি যাচ্ছেন আর কেবলই ভাবছেন, ‘কলুটার কী আশ্চর্য বুদ্ধি! কী কৌশলটাই খেলিয়েছে! গরুটার আর ফাঁকি দেওয়ার জো নেই। একটু থেমেছে কি ঘণ্টা বন্ধ হয়েছে, আর কলুর পো তেড়ে উঠেছে!’
এই রকম ভাবতে ভাবতে হঠাত্ তার মনে হলো, ‘আচ্ছা, গরুটা যদি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ে তাহলেও তো ঘণ্টা বাজবে, তখন কলুর পো টের পাবে কী করে?’
ভট্চার্যি মশায়ের ভারি ভাবনা হলো। গরুটা যদি শয়তানি করে ফাঁকি দেয়, তা হলে কলুর তো লোকসান হয়। এই ভেবে তিনি আবার কলুর কাছে ফিরে গেলেন। গিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হে, ঐ যে ঘণ্টার কথাটা বললে, ওটার মধ্যে একটা মস্ত গলদ থেকে গেছে। গরুটা যদি ফাঁকি দিয়ে ঘণ্টা বাজায়, তাহলে কী করবে?’
কলু বিরক্ত হয়ে বললে, ‘ফাঁকি দিয়ে আবার ঘণ্টা বাজাবে কী রকম?’ পণ্ডিতমশাই বললেন, ‘মনে করো যদি এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ে, তা হলেও ত ঘণ্টা বাজবে, কিন্তু ঘানি ত চলবে না। তখন কী করবে?’
কলু তখন তেল মাপছিল, সে তেলের পেয়ালাটা নামিয়ে পণ্ডিতমশায়ের দিকে ফিরে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘আমার গরু কি ন্যায়শাস্ত্র পড়ে পণ্ডিত হয়েছে, যে তার অত বুদ্ধি হবে? সে আপনার টোলে যায়নি, শাস্ত্রও পড়েনি, আর গরুর মাথায় অত মতলব খেলে না।’
পণ্ডিতমশাই ভাবলেন, ‘তাও তো বটে। মূর্খ গরুটা ন্যায়শাস্ত্র পড়েনি, তাই কলুর কাছে জব্দ আছে।’
লেখক : রম্যরচয়িতা
