‘জীবন দেব, তবু ফসলি জমিতে বালু ভরাট নয়’

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২২, ০১:০৬

মাঠ ভরে আছে সবুজ ধানে। ভোরের সূর্যের আলোয় শিশিরে ভেজা সবুজ ধানখেত চিকচিক করছে। সেই সঙ্গে কৃষকের মনে দোলা দিচ্ছে সোনালি ধান গোলায় তোলার স্বপ্ন। কিন্তু শত শত কৃষকের সেই স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে চলেছে। কারণ খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের এই ৩০০ একর উর্বর কৃষিজমিতে পশুর নদের বালু ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। কৃষকরা বলছেন, এটি করলে নিঃস্ব হয়ে যাবেন তারা, কারণ বালু ফেলার পর এই জমিতে আর কোনো ফসল ফলবে না, বিরান বালুর চর হয়ে যাবে পুরো এলাকা। তাদের একটাই কথা : ‘জীবন দেব, কিন্তু তিন ফসলি কৃষি জমিতে বালু ভরাট করতে দেব না।’

কৃষকরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্ভিক্ষের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলেছেন। কৃষিজমির ক্ষতি করে কোনো ধরনের উন্নয়ন করা যাবে না এবং এক ইঞ্চি জমিও ফাঁকা রাখা যাবে না বলে বারবার সতর্কবার্তাও উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন মানছে না।

সরেজমিন কৃষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ২০২০ সালে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ইনার বার প্রকল্পের আওতায় পশুর নদে ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ড্রেজিং করা বালুমাটি ফেলার জন্য ১ হাজার একর জমি হুকুমদখলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার চিলা ইউনিয়নের ৭০০ একর জমি সরকারিভাবে হুকুমদখলের মাধ্যমে বালুমাটি ভরাটের কাজ শুরু করা হয়। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০ একর জমিতে বালু ফেলার কাজ সম্পন্নও হয়েছে। এছাড়া খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের ৩০০ একর উর্বর কৃষিজমিতে বালু ফেলার প্রক্রিয়া শুরু করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ঐ জমি বন্দর কর্তৃপক্ষ তিনটি পোল্ডারে বিভক্ত করে। এই তিনটি জায়গা হচ্ছে বানিশান্তার আমতলা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে গ্রিন টাউন এলপি গ্যাস কোম্পানির উত্তর পাশে এবং বানিশান্তা ভোজনখালী সংযোগ সড়কের পূর্ব ও পশ্চিম পাশে।

ঐ কৃষিজমির আশপাশে রয়েছে বানিশান্তা, আমতলা, ভোজনখালী, ঢাংমারী ও খেজুরিয়া গ্রাম। এখানে ১০ থেকে ১২ হাজার লোকের বসবাস। এদের অধিকাংশই হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে খুলনা জেলা প্রশাসন বানিশান্তা এলাকার ২৫০ জন কৃষিজমির মালিককে হুকুমদখলের নোটিশ দেওয়া শুরু করলে জমির মালিকরা আপত্তি জানান। তারা তাদের জমিতে বালুমাটি না ফেলার জন্য অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করেন। তখন জেলা প্রশাসন অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য গণশুনানির আয়োজন করলেও সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মতামত উপেক্ষা করে মোংলা বন্দরের অনুকূলে বানিশান্তা ইউনিয়নের ঐ কৃষিজমি হুকুমদখলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর থেকে হুকুমদখল বাতিল এবং কৃষিজমিতে মাটিবালু ফেলার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসছেন এলাকার কৃষকরা। তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে ১১টি পরিবেশবাদী সংগঠনও নানা কর্মসূচি পালন করছে। 

বানিশান্তা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব অশোক রায় জানান, যতটুকু জানতে পেরেছি, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন ছলনার আশ্রয় নিয়ে আমাদের তিন ফসলি কৃষিজমিকে অকৃষি, অনুর্বর, ডোবা নালা, এসব জমিতে একটি মাত্র ফসল হয়, এসব কথা বলে সরকারকে ভুল তথ্য দিয়েছে। এছাড়া জনমত যাচাই ছাড়াই হুকুমদখল করে বালুমাটি ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এই জমিতে আষাঢ় থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত আমন ধান, পৌষ থেকে বৈশাখ পর্যন্ত এলাকার প্রধান অর্থকরী ফসল তরমুজসহ রবিশস্য চাষ করা হয়। এছাড়া বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত কিছু জমিতে আউশ ধানের চাষ হয়। এখন এই কৃষিজমিতে বালুমাটি ফেলা হলে এ এলাকা বিরান হয়ে যাবে। আর কোনো ফসল ফলবে না। হাজারো প্রান্তিক কৃষক নিঃস্ব হয়ে যাবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে আমাদের। একই অভিমত ব্যক্ত করেন কৃষক ধ্রুব বৈদ্য, খোকন শেখ, মনোজিৎ, বিজন বিহারী মণ্ডল, পাপিয়া মিস্ত্রি, বৈশাখি রায়, বিভাষ মণ্ডল, গৌতম রায়, সমির রায়, জামাল গাজী, সুশান্ত হালদারসহ আরো অনেকে।

বানিশান্তা ইউপি চেয়ারম্যান সুদেব কুমার রায় বলেন, ‘গত মাসে মাসিক সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সরকার বালু ফেলা স্থগিত করেছে। কিন্তু সম্প্রতি আবার বালু ফেলার তোড়জোড় শুরু করেছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। কৃষকদের এককথা, জীবন দেবে তবু কৃষিজমি বালু ভরাট হতে দেবে না।’

বানিশান্তা জমি রক্ষা কমিটির সভাপতি সত্যজিৎ গায়েন বলেন, ‘পশুর নদের খনন বন্ধ হোক আমরা সেটি চাই না। আমরা চাই তিন ফসলের জমি যেন নষ্ট না করা হয়, বিকল্প জায়গায় যেন বালু ফেলা হয়।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসান খান বলেন, ‘কৃষিজমি মাটিবালু দিয়ে ভরাট করলে জমিতে কোনো ফসল হবে না। এতে এলাকার কৃষকদের অনেক ক্ষতি হবে। তবে জমি তো রাষ্ট্রের এবং রাষ্ট্র চাইলে জমি দিতে হবে।’

দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘ যদি নিউজ করতে চান তাহলে সরাসরি সেখানে যান। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলব না’।

জানতে চাইলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের ৫ কোটি টাকা দিয়েছে। এনজিওদের (বেসরকারি সংস্থা) পৃষ্ঠপোষকতায় ভুয়া আন্দোলন করা হচ্ছে। যারা এই আন্দোলন করছে তারা দেশের উন্নয়ন চায় না।’

ইত্তেফাক/ইআ