ট্রাম্প বলয়ের পতন ঘটল!

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২২, ০২:২৪

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম ইলেকশন) একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। এই নির্বাচন শাসক দলের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অন্ধকারে ফেলে দেয়। বিগত ৯০ বছর ধরে ঘটে আসছে এমনটাই। ১৯৩২ সাল থেকে এখন অবধি অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে গড়ে ২৮ এবং সিনেটে চারটি আসন হাতছাড়া হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের। ২০১৮ সালে হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেস উভয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঠিক দুই বছরের মাথায় রিপাবলিকানরা হাউজের ৪০টি আসনসহ চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ হারায়। ২০১০ সালে একইভাবে ডেমোক্র্যাটরা হারিয়েছিল ৬৩টি আসন। এর আগে ১৯৯৪ সালে সিনেটের আটটিসহ নিম্নকক্ষের ৫৪টি আসন হারায় ক্ষমতাসীনেরা। 

নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার পর দুই বছরের মাথায় ভোটাররা সাধারণত নানাবিধ পাওয়া-না পাওয়ার আক্ষেপ ও ক্ষোভ নিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেন। ফলে অধিকাংশ সময়ই ফলাফল যায় ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে। কিন্তু এ বছর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। এবারের ফলাফল সত্যিকার অর্থেই ‘অত্যাশ্চর্য ফলাফল’! ডেমোক্র্যাটরা ঐতিহাসিক ধারাকে উলটে দিয়েছে। এমনকি এ কথা বললেও অত্যুক্তি হবে না, মার্কিন গণতন্ত্রকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান দলের খামখেয়ালিপনা ও বাড়াবাড়ির হাত থেকে রক্ষা করেছেন ভোটাররা। সম্পূর্ণ ফলাফল হাতে আসতে এখনো অপেক্ষা করতে হবে যদিও, কিন্তু রিপাবলিকানদের যেই লাল সুনামির কথা শোনা গিয়েছিল, দেখা গেল তার মহাবিপর্যয় ঘটেছে। ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে—হিসাব বলছে এমনটাই। প্রতিনিধি পরিষদেও তাদের অবস্থা ধারণার চাইতেও অনেক ভালো। 

মনে রাখতে হবে, বছরের শুরুতে ডেমোক্র্যাটদের এমন ফলাফল কল্পনা করা কার্যত ‘আকাশকুসুম’ বলে মনে হচ্ছিল। ডেমোক্র্যাটদের ঘাড়ে শুধু ইতিহাসের ধারাবাহিক ফলাফলই গরম নিঃশ্বাস ফেলছিল না; এর সঙ্গে চেপে বসেছিল ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও টালমাটাল অর্থনীতি। উপরন্তু, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জনপ্রিয়তা তথা তার প্রতি মার্কিন জনগণের সমর্থন নিচের দিকে নামছিল দ্রুতগতিতে। বাইডেনের ওপর থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছিল এবং সে কারণে নির্বাচনের আগে তার ওপর মানুষের আস্থার রেটিং চল্লিশের ঘরে ওঠানামা করছিল! ঠিক এমন একটি পরিস্থিতিতে রিপাবলিকানরা ‘লাল তরঙ্গ’ বইয়ে দেবে বলেই মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তেমনটা ঘটেনি। 

জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টের ‘রো বনাম ওয়েড’ মামলা, প্রজননস্বাস্থ্য অধিকার রক্ষার ৫০ বছরের সাংবিধানিক গ্যারান্টি তুলে নেওয়া এবং কার্যত রাতারাতি মার্কিন নারীদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার মতো ইস্যুগুলো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চরম উত্তাপ ছড়ায়। একদিকে যখন এসব চলছিল, অন্যদিকে তখন গ্রীষ্মে কংগ্রেসনাল ডেমোক্র্যাটরা অর্জন করে উল্লেখযোগ্য আইনি সাফল্য। একই সঙ্গে ২০২০ সালের নির্বাচনি প্রচারণার সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে কয়েক লাখ ছাত্রের ঋণ মওকুফের ঘোষণা আসে হোয়াইট হাউজ থেকে। সব মিলিয়ে জোর হাওয়া লাগে ডেমোক্র্যাটদের পালে। এরপর আর তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি বাইডেনের। ‘গর্ভপাত ইস্যু’ ছাড়া তেমন কোনো বড় ইস্যু ডেমোক্র্যাটদের পথ মেলে দাঁড়ায়নি। আগস্টে কানসাসের গণভোট বাইডেনকে ভোগাবে বলে আশঙ্কা করা হলেও তা ভালোভাবেই উতরে যান বাইডেন। 

ডেমোক্রেটিক দলের প্রচারণা উপদেষ্টারা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, গর্ভপাতকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করলে তা হবে কোটি টাকার কাজ। এই পরামর্শ বেশ কাজে দিয়েছে বলা যায়। যেসব রাজ্য রিপাবলিকানদের দিকে ঝুঁকে ছিল, গর্ভপাতের বিধিনিষেধের রায়ের পর সেগুলো ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের জন্য নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। শহরতলির জেলাগুলোতেও সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ ভোটাররা ডেমোক্রেটিক জোটের দিকে হাঁটতে শুরু করে। এভাবেই ক্রমাগতভাবে কাজ সহজ হয়ে যায় বাইডেনের জন্য। 

মজার ব্যাপার হলো, রিপাবলিকানদের মধ্যে যারা ট্রাম্প-সমর্থিত ছিলেন, এমনকি যারা প্রথমবারের মতো প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নামেন, তাদের কেউই আশানুরূপ ফলাফল পাননি। বরং যেসব রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাইকেই কোনো না কোনোভাবে মুশকিলে পড়তে হয়েছে। 

প্রকৃতপক্ষে বিগত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের সম্ভাব্য পরিসমাপ্তি দেখছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা! এমনকি এই নির্বাচনকে অনেকেই গণতন্ত্রের যবনিকাপতন হিসেবে চিত্রিত করেছিলেন! ‘২০২০ সালে ভোট কারচুপির মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছ থেকে ক্ষমতা হস্তগত করা হয়েছে’—এমন বদ্ধমূল ধারণা পোষণ করা রিপাবলিকানরা নির্বাচনে জিতে অফিসে বসার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছিল! কিন্তু দিন শেষে দেখা গেল, তারা হতাশাজনক হার হেরেছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব রিপাবলিকান প্রার্থী তথা ট্রাম্পের কট্টর ভক্ত-অনুসারী নির্বাচনে হেরেছেন, তারা কি ফলাফল স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবেন? নাকি ট্রাম্পের দেখানো পথে হাঁটতে চাইবেন? ফলাফল মেনে নিতে ট্রাম্প যে কী ধরনের বাহানা করতে পারেন, কত প্রকারের খোঁড়া অজুহাত দাঁড় করাতে পারেন, এমনকি কতটা আগ্রাসী পথে হাঁটতে পারেন তার কর্মী-সমর্থকেরা, তা কারো অজানা নয়। তবে আশার কথা হলো, নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক রিপাবলিকান, বিশেষ করে যারা নির্বাচনে হেরেছেন, পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে। কোনো সন্দেহ নেই, মার্কিন গণতন্ত্রের শক্তি এটাই এবং সম্ভবত এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে বলা হয় ‘সর্বসেরা’।

বলে রাখা ভালো, রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের ছড়ি ঘোরানো চলছেই। তার দমন-পীড়ন কবে শেষ হবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কি না, তা শিগিগরই খোলাসা করবেন বলে মনে করা হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, অনেক রিপাবলিকান নেতা চান না ট্রাম্প ফিরে আসুক। তবে সত্যি সত্যিই যদি ট্রাম্প ফিরে আসতে চান, তাহলে তা রিপাবলিকানদের ফেলে দিতে পারে এক কঠিন সমীকরণে। প্রেসিডেন্ট পদের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় যেভাবেই হোক উতরে যেতে চাইবেন ট্রাম্প। কিন্তু এক্ষেত্রে তার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন দা সান্তিস। কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না, রিপাবলিকান পার্টি ও মার্কিন জনগণের কাছে দা সান্তিস ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। সুতরাং, মনোনয়ন বৈতরণি পার হওয়াটা ট্রাম্পের জন্য খুব একটা সহজ হবে না। আরো একটি বিষয় বলে রাখা দরকার, নির্বাচন এবং বিভিন্ন ইস্যুতে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে বেশ কয়েক দফা ট্রাম্পকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হয়েছে। তাই ট্রাম্প যদি কোনো ফাঁক গলে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন হাসিল করেও নেন, তা খুব একটা বিচলিত করবে না ডেমোক্রেটিক শিবিরকে। ট্রাম্প কিংবা রিপাবলিকানদের কোনোমতেই এই আশা করার কারণ নেই—চব্বিশের (২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন) খেলাটা ভিন্ন ধাঁচের হবে। বরং ডেমোক্র্যাটরা আগেকার মতোই মাঠে নামবে এবং ট্রাম্পকে কুপোকাত করবে বলে মনে হচ্ছে।
লেখক :মার্কিন রাজনীতি বিশেষজ্ঞ
সিএনএন থেকে অনুবাদ : সুমৃৎ খান সুজন

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন