সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন এবং সরকারি বিভিন্ন আদেশ-নির্দেশনা সম্পর্কিত ৯১ হাজার ক মামলা ঝুলছে বছরের পর বছর। একই বিষয়ের ওপর একাধিক মামলা থাকলেও সেগুলো একত্র করে নিস্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলে এত মামলার চাপ বাড়তো না। মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়-বিভাগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উদাসীন এমন কথাই বলছেন সংশ্লিষ্টরাই। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সব মন্ত্রণালয় বিভাগে পূর্নাঙ্গ আইন শাখা ও কর্মকর্তা না থাকায় পরিস্থিতি মামলা নিষ্পত্তিতে ধীর গতি প্রলক্ষিত হয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ গুরুত্বপূর্ণসব আইনী বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে পরাপর্শ দেওয়ার পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় উত্থাপনীয় আইনের খসড়া পর্যালোচনা করে তা মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করে থাকে। কিন্তু সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে দুই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা দিয়ে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইতিপূর্বে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আইন শাখা বা আইনী পরাপর্শক নিয়োগের সুযোগ ছিল।
সূত্র জানায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাস্তব নিরিখে ইতিমধ্যে এ বিভাগে একটি পূর্নাঙ্গ অনুবিভাগ স্থাপনের জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়্ । এতে অনুবিভাগের অধীন আইন অধিশাখা-১ আইন অধিশাখা-২ এবং আইন অধিশাখা ১এর অধীন আইন শাখা-১ ও আইন শাখা ২ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এ ছাড়া আইন অধিশাখা-২ এর অধীনে আইন শাখা ৩ ও আইন শাখা ৪ গঠনের কথা বলা হয়েছে। গত ২০১৯ সালের ২০ আগস্ট এই প্রস্তাবনা তৈরি করা হয় এবং ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রশাসন ক্যাডারের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একজন উপসচিব ও তিনজন সিনিয়র সহকারি সচিবের সমন্বয়ে আইন অনুবিভাগ গঠন করা হয়। কিন্তু কার্যত মামলার সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। বাস্তবে মামলা নিষ্পত্তির হার সন্তোষজনক নয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা রাষ্ট্রের কোন অঙ্গের হাতে থাকবে সেটি দীর্ঘ ৮ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে নেওয়া হয়। এই সংশোধনের বিরুদ্ধে রিট হলে হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেন। আপিল বিভাগও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর পর সরকারের পক্ষ থেকে রিভিউর অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তুপ্রণীত সে বিষয়ে অদ্যাবধি আপীল বিভাগে শুনানীও হয়নি।
২০০৯ সালে জনপ্রিয় মোবাইল কোর্ট আইনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ১১ অক্টোবর এক ভুক্তভোগী রিট করেন। এ মামলায় ২০১৭ সালের ১১ মে হাইকোর্ট সরকারের বিরুদ্ধে রায় দেন। গত পাঁচ বছরেও এ মামলাটির শুনানি হয়নি।হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টে এ রকম সরকার-সংশ্লিষ্ট লক্ষাধিক মামলা ঝুলছে। পাশাপাশি কত যে আদালত অবমাননার মামলা ঝুলছে সচিবদের ঘাড়ে তার ইয়ত্তা নেই।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের ৫৬ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসব মামলা নিয়ে বেশি ঝামেলায় থাকেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ছাড়াও ৮ বিভাগীয় কমিশনার অফিসসহ সব দপ্তর-সংস্থা থেকে সব মামলার (সরকার-সংক্রান্ত) তথ্য নিয়েছে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে এ বিষয়ক মামলার সংখ্যা ৯০ হাজার ৮২টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৯৫ মামলাকে 'গুরুত্বপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
- কোন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে কত মামলা
সবচেয়ে বেশি মামলা নিয়ে ধুকছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (এনবিআর)। এ বিভাগের মামলার সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৫৭টি। ১১ হাজার ৯৫১ মামলা রয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ঘিরে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের ৬ হাজার ৮৩৪, অর্থ বিভাগের ৫ হাজার ৪১৮, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশন অফিসের ৫ হাজার ১৬, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৩ হাজার ৫৯ মামলা আছে। এক থেকে দুই হাজারের মধ্যে মামলা রয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, ঢাকার বিভাগীয় কমিশন অফিস, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে।
- নিষ্পত্তিতে এগিয়ে যারা
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি মামলার নিষ্পত্তির দিক থেকে এগিয়ে আছে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ; এদের কোনো মামলাই নেই। কমসংখ্যক মামলা থাকা মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে- অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (একটি), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (ছয়টি), পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় (চারটি), পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ছয়টি), পরিকল্পনা বিভাগ (৯টি) ও আইএমইডি (চারটি)।
- কেন বাড়ছে মামলা
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোতে আইন-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের উদাসীনতা , বিচারে উভয়পক্ষের দীর্ঘসূত্রতা, বেসরকারি স্বার্থ-সংশ্লিষ্টদের ছলচাতুরীসহ বিভিন্ন কারণে এসব মামলা নিষ্পত্তি না হয়ে দিন দিন বাড়ছে। তবে উচ্চ আদালতে থাকা সরকারের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইং থেকে ঠিক মতো পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তবে বিষয়টি শুধু সলিসিটর উইংয়ের ওপর নির্ভর করে না। উল্লেখ করে একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, সলিসিটর উইং নিজেরা মামলা শুনানি করে না, অনেকটা সমন্বয়ের কাজ করে।
মামলাগুলোর ধরন পর্যালোচনা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি মামলার সংখ্যাও বেশ। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিরুদ্ধে সরকারেরই অপর মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মামলা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের (সমন্বয় ও সংস্কার) নেতৃত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত একটি কমিটি আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিরোধগুলো আদালতে না গিয়ে ওই কমিটিতে পাঠিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
