বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় আমাদের করণীয়

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩:০০

সর্বস্বান্ত মানুষগুলোর পাশে থেকে সাধ্যানুসারে সহযোগিতা করলে প্রত্যক্ষভাবে আমরা যেমন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সফল হব, তেমনি পরোক্ষভাবে পরকালে থাকবে আল্লাহর সীমাহীন অনুগ্রহ।

দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সফলকাম হতে কিছু নির্দেশনা তুলে ধরা হলো:

সর্বক্ষেত্রে অপচয় রোধ করা: অপব্যয়ী জীবনে কোনো এক সময় কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে আদমসন্তান! তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় সুন্দর পরিচ্ছদ পরিধান করো, খাও ও পান করো এবং অপব্যয় কোরো না। তিনি অপব্যয়ীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত ৩১) অপব্যয়ীরা শুধু আল্লাহর অপছন্দনীয়ই নয়; বরং শয়তানের ভাই বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআনে আরো ইরশাদ হচ্ছে, ‘এবং কিছুতেই অপব্যয় কোরো না। নিশ্চয়ই অপব্যয়ীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা ইসরা, আয়াত ২৬-২৭) এ সম্পর্কে বিশ্বনবি (স.) হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ ফরমান, তোমরা পানাহার করো, দান-খয়রাত করো এবং পরিধান করো। যেন তাতে অপচয় বা অহংকার যুক্ত না হয়।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৬০৫)

জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু রাখা: মানবকল্যাণ ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্লোগান। সেই ধারা অব্যাহত রাখলে যাবতীয় দুর্যোগের মতো দুর্ভিক্ষ ঠেকানো সম্ভব। আর তা হলো, অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু রাখা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ইমানদার পুরুষ ও ইমানদার স্ত্রীলোকেরাই প্রকৃতপক্ষে পরস্পর পরস্পরের বন্ধু ও সাহায্যকারী। তাদের পরিচয় এবং বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা নেক কাজের আদেশ দেয়, অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে, আল্লাহ ও রসুলের বিধান মেনে চলে। প্রকৃতপক্ষে তাদের প্রতিই আল্লাহ রহমত বর্ষণ করবেন।’ (সুরা তাওবা, আয়াত ৭১) স্বাবলম্বীদের সম্পদে ফকির, মিসকিন, গোলাম, ঋণগ্রস্ত, মুসাফির প্রমুখদের আড়াই শতাংশ অধিকার রয়েছে। তা আদায় না করলে একদিকে সম্পদ যেমন পবিত্র হয় না, পক্ষান্তরে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত। নবি করিম (স.) ইরশাদ করেন, কোনো জাতি জাকাত না দিলে আল্লাহ তায়ালা তাদের দুর্ভিক্ষে নিপতিত করেন।’ (সহিহ আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, হাদিস ৭৬৩/মুজামুল আওসাত লিত-তাবরানি, হাদিস ৪৫৭৭)

সুদের আদান-প্রদান বন্ধ করা: প্রত্যক্ষ বিলাসিতার আরেক নাম সুদ। মহান প্রভু ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ সুদকে হ্রাস (দারিদ্র) করেন এবং সাদাকাকে বর্ধিত (অঢেল সম্পত্তি) করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ২৭৬)  সুদ সম্পদের বরকত নষ্ট করে দেয় এবং দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (স.)কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, যে জাতির মধ্যে সুদ প্রসারিত হয়, তারা দুর্ভিক্ষে নিপতিত হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১৭৮২২)

ব্যভিচার বন্ধ করা: উদ্বেগজনক হারে জিনা তথা ব্যভিচার বেড়েই চলেছে। ঘরবাড়ি, পথঘাট এমনকি শিক্ষাঙ্গনে পর্যন্ত এই জাহেলিয়াত বিস্তার লাভ করেছে। কর্মফলস্বরূপ একের পর এক আজাব-গজব লেগেই থাকে। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন, কোনো জাতির মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপকতা ঘটলে তারা নিজেরাই যেন হাতে ধরে তাদের ওপর আল্লাহ তায়ালার আজাব নিপতিত করল।’ (সহিহ আত-তারগিব ওয়াত-তারহিব, হাদিস ২৪০১) জিনা বা ব্যভিচারে যেসব আজাব আসে, তন্মধ্যে সর্বশেষ হলো এসব জনপদে দুর্ভিক্ষের প্রসার ঘটবে। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (স.)কে বলতে শুনেছি, যে সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যভিচারের ব্যাপকতা লাভ করে, তারা দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস ৩৫৮২) তাই আল্লাহ তায়ালা মানবজাতিকে জিনা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়ে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা অবৈধ যৌন সংযোগের নিকটবর্তী হয়ো না। এটা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট আচরণ।’ (সুরা ইসরা, আয়াত ৩২)

নির্ধারিত পরিমাণের (ওজন) চেয়ে কম দেওয়া রোধ করা: বিশ্বস্ততাকে অসহায়ত্ব ভেবে অনুমোদিত বা নির্ধারিত (ওজন/পরিমাণ) পণ্যদ্রব্য ও অর্থ কম দেওয়া সমাজের রন্দ্রে রন্দ্রে মিশে আছে, যার কারণে অর্থকষ্ট ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। হাদিসে এসেছে, ‘হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল (স.) ইরশাদ করেন, ...যখন কোনো সম্প্রদায়ের লোকেরা ওজন/ওয়াদাকৃত (নির্ধারিত অর্থ) কম দেয়। তখন শাস্তিস্বরূপ তাদের খাদ্য-শস্য উত্পাদন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং দুর্ভিক্ষ তাদের গ্রাস করে...।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০১৯)

মহান প্রভু এ সম্পর্কে ইরশাদ করেন, ‘ধ্বংস; যারা পরিমাপে কম দেয় তাদের জন্য। অথচ তারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় (নির্ধারিত) পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত ১-২)

বেশি বেশি তাওবা (ইস্তিগফার) করা: পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে জলে ও স্থলে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। তিনি তাদের কোনো কোনো কাজের শাস্তি আস্বাদন করান, যাতে তারা (অসত্ পথ থেকে) ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত ৪১) সুতরাং দুর্ভিক্ষকে মোকাবিলা করতে তাওবার বিকল্প নেই। ইরশাদ হচ্ছে, ‘(আমি) বলেছি! তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। (তোমরা তা করলে) তিনি অজস্র ধারায় তোমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন জান্নাত ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা।’ (সুরা নুহ, আয়াত :১০-১২)

লেখক: আলেম ও ইসলামি গবেষক

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন