বৃহস্পতিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

শিক্ষার্থীদের বাকি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু দোকানি নিঃস্ব

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ২২:০১

বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানে অনেক শিক্ষার্থী বাকিতে কেনাকাটা করে বা খেয়ে টাকা না দেওয়ায় অনেকে ভয়ানক বিপদে পড়ছেন। পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ায় নিরুপায় হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অলিম উদ্দীন নামে একজন দোকানি ৩৪ বছর ব্যবসা করার পর নিঃস্ব হয়ে শূন্য হাতে গ্রামে ফিরে গেছেন। আলোড়ন সৃষ্টি করা এ খবরের সূত্র ধরে ডয়চে ভেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দোকানগুলোর অবস্থা জানার চেষ্টা করেছে। তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ দোকান মালিকেরই দাবি-পণ্য বিক্রি করে টাকা না পাওয়ায় তাদের অবস্থা শোচনীয়! 

করোনা মহামারির পর অনেক দোকানিই আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরেননি। দোকান খোলার মতো পুঁজি নেই তাদের। করোনার আগে শিক্ষার্থীদের কাছে যে টাকা পাওনা হয়েছিল সেই টাকাও পাচ্ছেন না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলের সামনে ৪১ বছর ধরে সোহেল স্টোর নামে একটি দোকান চালাচ্ছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমীর আলী, লতিফ ও শাহ মাখদুম হল চটত্বরে ২০টির মতো দোকান ছিল। করোনার পর মাত্র ৬টি দোকান তারা খুলেছেন। অন্যরা পুঁজির অভাবে দোকানগুলো খুলতে পারছেন না।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩৪ বছর ধরে ‘প্রয়াস’ নামে একটি খাবারের হোটেল চালিয়েছেন অলিম উদ্দীন। গত ৩১ অক্টোবর তিনি দোকান বিক্রি করে দিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। বর্তমানে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে আছেন। তার দোকানটি যিনি কিনেছেন তিনি এখন নাম দিয়েছেন ‘শাহজালাল হোটেল’।

৩৪ বছরের ব্যবসা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার কারণ জানতে চাইলে টেলিফোনে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘করোনার আগেই বাকি পড়েছিল ৬ লাখ টাকার মতো। মালিকের কাছে অগ্রিম হিসেবে দেওয়া দুই লাখ টাকা ফেরত চাইলে তিনি দুই বছরের ভাড়া হিসেবে ৬৯ হাজার টাকা কেটে ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা ফেরত দেন। পরে আবার ৩১ হাজার টাকা কেটে রাখেন। বাকি এক লাখ টাকা দিয়ে আর দোকান চালাতে পারিনি, কারণ, আমার কাছেও মানুষ দেড় লাখ টাকার মতো পাবে। যাদের কাছে বাকি আছে চাইলেও তারা টাকা দিচ্ছে না।’

বাকি কারা বেশি খেয়েছে জানতে চাইলে অলিম উদ্দীন বলেন, ‘সাধারণ ছাত্রদের কাছে কিছু বাকি আছে। কিন্তু বেশি বাকি হল ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যারা থাকে, জুনিয়র নেতা, তাদের কাছে। এখন বাড়িতে আসার পর ৩০ হাজার টাকার মতো বিকাশের মাধ্যমে পেয়েছি। অনেকেই ফোন করছে। কিন্তু টাকা তেমন আসছে না।’

করোনার পর থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লতিফ হলের এই দোকানটি আর খোলেনি। ছবি: ডয়চে ভেলে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাউল হলের সাবেক ডাইনিং ম্যানেজার ইকবাল হোসেন। ৫ বছর তিনি ডাইনিং চালিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের কাছে তার পাওনা ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ইকবাল হোসেন বলেন, ‘বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও টাকা উদ্ধার করতে না পেরে কয়েকদিন আগে ডাইনিংয়ের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি।’ 

এ এফ রহমান হলের ক্যাফেটোরিয়ার ম্যানেজার হেলাল উদ্দিন গত ২০ অক্টোবর ক্যাশ টেবিলের উপর একটি সাদা কাগজে লিখে রেখেছিলেন ‘দয়া করে সকলে নগদ খান, আমি বাজার করতে পারি না’। 

হেলাল উদ্দিন জানালেন, ‘দুই দিন কাগজটি রেখেছিলাম। সবাই অনুরোধ করলো ওটা তুলে ফেলতে, তাই পরে সরিয়ে ফেলেছি। আসলে বাকি এত বেশি হয়ে গেছে যে, দৈনিক বাজার করাটাই কঠিন হয়ে গেছে।’ গত জানুয়ারি মাসে কলা অনুষদের পাশে ‘নাজিম স্টোরে’র মালিক নাজিম উদ্দিন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেছিলেন, ‘বাকির কারণে ব্যবসা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে আমার।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আখতার হোসেন বলেন, ‘‘আমার একটা মুদি দোকান আছে। আমার নিজের বাকিও ৫-৬ লাখ টাকার কম না। শুধু শিক্ষার্থী না, শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও আমার কাছ থেকে বাকি নেন। শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেহেতু এখানে থাকেন, ফলে তাদের টাকা উদ্ধার হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের কাছে বাকির কারণে ক্যাম্পাসে দোকান চালানো দুরূহ হয়ে পড়ছে। বাকির ভারে অলি ভাইকে শেষ পর্যন্ত ক্যাম্পাস ছেড়েই চলে যেতে হয়েছে। তার মতো আরও ৫-৬ জন আমাকে জানিয়েছেন, তারাও আর চালাতে পারছেন না। দোকান বন্ধ করে দেবেন।’

গত বছরের মার্চে বাকিতে সিগারেট না দেওয়ায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহণ মার্কেটের ক্যাম্পাস ফুড কর্নারের মালিক শাহ আলমকে মারধর করেন ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা-কর্মী। ক্যাম্পাসে বাকির অবস্থা কী জানতে চাইলে সোহেল স্টোরের মালিক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার পর জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে। ছাত্রদের কাছে টাকা না থাকায় বিক্রিও কমে গেছে। তার মধ্যে যদি ফাও চলে যায়, তাহলে তো দোকানদারি করাই মুশকিল। এমনিতে বাকির ভারে জর্জরিত। ফলে দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে ১৪ বছর ধরে হোটেল চালান মো. হাবিবুর রহমান। ব্যবসার অবস্থা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দোকানে কোনো বাকির খাতা নেই। আমি নগদে বিক্রি করি। আর যে বাকির কথা বলে সেটা আমি ফাও হিসেবে ছেড়ে দেই। ছাত্রনেতারা তো জিলাপি-সিঙ্গাড়া খেয়ে চলে যায়, সেটা আমি ফাও হিসেবেই ধরে নেই। কারণ, এসব বাকি কখনও উদ্ধার হয় না। ফলে আমি বাকি বলে কিছু রাখিনি।’

কেমন ফাও দিয়ে হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা তো দিতেই হয়, খুব বেশি না। দোকানদারি করে চালানটা বাঁচে আরকি। সবারই এখন পুঁজির সমস্যা। অধিকাংশ দোকারদারই করোনার পর আর ক্যাম্পাসে ফেরেনি।’

বাকিতে খেয়ে টাকা না দেয়ার প্রবণতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও কি একই রকম? মধুর ক্যান্টিনের মালিক অরুন দে তার অবস্থা জানালেন এভাবে, ‘এই মুহূর্তে আমার বাকি ৫০ হাজার টাকার মতো। সবসময় এমনই থাকে। কিন্তু আমাদের কাছে বাকি রেখে ক্যাম্পাস ছেড়েছে বহু ছাত্র, ছাত্রনেতা। তাদের অনেকেই এখন বড় অবস্থানে আছে। অনেকে ফিরে এসেও টাকা দিয়ে গেছে। এভাবেই আমরা যুগ যুগ ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছি। বাকি আমাদের জন্য খুব একটা সমস্যা না। কিছু বাকি, কিছু ফাও এসব মিলেই আমরা ব্যবসা করি। আমাদের মূল সমস্যা হলো, মধুর ক্যান্টিনের সংস্কার করা প্রয়োজন। বারবার বলার পরও প্রশাসন এটা করে দিচ্ছে না।’

রাজশাহী শ্বিবিদ্যালয়ের মাদার বখশ ও সোহরাওয়ার্দী হলের মাঝখানে দোকান। ছবি: ডয়ছে ভেলে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাত্তর হলের সাবেক ক্যান্টিন ম্যানেজার মো. সোহেল। ৫ বছর ক্যান্টিন চালানোর পর গত মাসে ছেড়ে দিয়েছেন। সোহেল বলেন, ‘২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আমার বাকি। ১২ লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন শূন্য হাতে ক্যান্টিনের দায়িত্ব ছেড়ে দিলাম। কারণ, আর বাজার করে খাওয়াতে পারছিলাম না। যাদের কাছে টাকা পাবো বারবার তাদের বলেছি, কিন্তু টাকা দেয়নি।’ কাদের কাছে এই বাকি? সোহেল বলেন, ‘সাধারণ ছাত্রও আছে, ছাত্র নেতাও আছে। সবচেয়ে বেশি হলো যারা নেতাদের পেছনে পেছনে ঘোরে তাদের কাছে। ওরা নিজেদের খুব পাওয়ারফুল মনে করে। অনেকের কাছেই বিষয়টি বলেছি, কিন্তু কেউ সমাধান দেয়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জসিম উদ্দিন হলের সামনে ২০০৩ সাল থেকে দোকান চালান সোহেল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমার বাকি ৪০ হাজার টাকার মতো। গত ১৯ বছরে বাকি নিয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছে বহু ছাত্র। সেই টাকার পরিমাণ ৪ লাখের কম হবে না। দোকান ভাড়া দিতে হয়, জিনিসপত্রের দামও বেশি। কিন্তু আমরা তো ছাত্রদের কাছ থেকে বেশি দাম নিতে পারি না। ফলে আমাদের পক্ষে দোকান চালানোই কঠিন হয়ে গেছে।’ ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে জানতে চাইলে সোহেল বলেন, ‘আপনারা তো সবই বুঝতে পারেন কারা বেশি বাকি খায়। এসব বলে আবার কোন বিপদে পড়ি। তবে সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দিন দিন দোকান চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

বাকিতে কেনাকাটা বা খাওয়া নতুন কোনো প্রবণতা নয়। তবে এখন বিষয়টি কেন কোনো কোনো দোকান মালিকের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করছে? এ প্রসঙ্গে ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমি ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে বলবো না। কিছু ছাত্রনেতার যদি নৈতিক অবক্ষয় হয় সেটা ভালো না। এখনও অনেক সংগঠনই আছে, যাদের নেতাদের বিরুদ্ধে আপনি কোনো অভিযোগ করতে পারবেন না। ছাত্র ইউনিয়নের কোনো নেতা কি কোনো দোকান থেকে বাকি খেয়েছে বা ফাও খেয়েছে সেটা বলতে পারবেন? পারবেন না। কেউ যদি এমনটা করে থাকে, সেটা ঠিক করেনি। আমাদের সময় এমন অভিযোগ কেউ করতে পারেনি।’

(জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের হয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন সমীর কুমার দে। এই প্রতিবেদনের সব ধরনের দায়ভার ডয়চে ভেলের।)

ইত্তেফাক/এএএম