রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

লাতিন শিল্প নাকি ইউরোপের দুর্বার গতি?

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২২, ২০:১৫

একদিকে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিকতার ছোঁয়া, অন্যদিকে ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবলের গতির ঝড়। ফুটবল প্রেমীদের কাছে দুই মহাদেশের লড়াই যেন নিঃসন্দেহে লোভনীয় খাবার দেখে জিভে জল আসার মতোই। বিশ্বকাপ এলেই যেন একটু বেশি করেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে লাতিন বনাম ইউরোপের এই লড়াই। 

অপেক্ষার পালা শেষ হতে চলেছে, আর মাত্র কিছুক্ষণ পরই কাতারের মাটিতে বেজে উঠবে বিশ্বকাপের বাঁশি। আরাধ্য সেই সোনালি ট্রফির জন্য লড়াইয়ে নামবে ৩২টি দল। ৩২ দল বলাটা কি একটু ভুল হবে? আজ পর্যন্ত যে ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার বাইরের কোন দেশ বিশ্বকাপের স্বাদ পায়নি। এবারের বিশ্বকাপেও মূল লড়াইটা যে হবে এই দুই মহাদেশের তা হয়তো নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

ফুটবলের মাঠে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথে যেমন আগুনের ফুলকি ওঠে দুই দলের শিবিরে, তেমনি লাতিন বনাম ইউরোপের লড়াইয়ের মাঝেও থাকে উত্তপ্ত বারুদের ঝাঁঝ। লাতিন ফুটবল আর ইউরোপীয় ফুটবলের লড়াইটা সেই আদিকালের। বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল এগিয়ে গেছে খানিক ব্যবধানে, তবে ইতিহাস বলে ঔপনিবেশিক অঞ্চল ছাপিয়ে বিশ্বের বুকে রাজত্ব কায়েম করার ইতিহাস আছে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিকতার সৌন্দর্য্যেরও।

মহাদেশীয় ফুটবলে শৈল্পিকতার ছোঁয়ায় প্রকাশ পায় লাতিন ফুটবলের বনেদিয়ানা, যেখানে ফুটবলের মাঠেও পায়ের কারুকার্যে বেজে ওঠে অর্কেস্ট্রার সুর। অন্যদিকে, ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলে আক্রমণ আর গতির ঝড় তুলে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেওয়ার মানসিকতা।

শৈল্পিক কারিকুরির নান্দনিকতায় পূর্ণ লাতিন ট্যাকটিক্স, নাকি গতির ঝড় তোলা ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল? ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বে সেরা কারা, যে বিতর্ক চলমান সেই শতবর্ষ ধরেই। বিশ্বকাপ যেন সেই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়ার আরও  উৎকৃষ্ট মঞ্চ। সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয়ানদের এগিয়ে যাওয়ার যে পরিসংখ্যান তা তো এই বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকেই উত্থিত। লাতিন আমেরিকার কোনো দেশ হিসেবে শেষবার ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের পেরিয়ে গেছে ২০ বছর। সেই ২০০২ সালে এশিয়ার মাটিতে হওয়া জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিলো সেলেসাওরা। তারপর থেকে বিশ্বকাপের ট্রফি যেন অচেনাই হয়ে গেছে লাতিনদের কাছে। সর্বশেষ চার আসরের চারটি শিরোপাই গেছে ইউরোপীয়ানদের ঘরে। ব্রাজিলের ঘরের মাঠের ২০১৪ বিশ্বকাপের শিরোপাও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে জার্মানি। 

ইউরোপীয়ানদের এমন আধিপত্যের মধ্যেই এবার নতুন করে আশা দেখাচ্ছে লাতিন শিল্পের দুই কারিগর ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। সেলেসাওদের সাম্বা আর আলবিসেলেস্তাদের লা স্ক্যালোনেতা যেন লাতিনদের বিশ্বকাপের পালে নতুন করেই হাওয়া দিয়েছে। মেসি-নেইমারদের দুই দলই বিশ্বকাপে এসেছেও শিরোপা জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার হয়েই। লাতিনদের সাহসকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কিছুদিন আগেই ইউরো চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে লা ফিনালিসিমার শিরোপা জিতে নেওয়া লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। এছাড়াও মেসি বাহিনী রয়েছে টানা ৩৬ ম্যাচ ধরে অপরাজিত। বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচ জিতলেই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলবে আর্জেন্টিনা। 

এদিকে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিকতার কারুকার্যের ইতিহাসে যেই জোগো বোনিতো বা সাম্বার ছন্দের কথা সবার আগে মনে পড়ে, সেই ব্রাজিল এবার বিশ্বকাপে এসেছে দুর্দান্ত এক স্কোয়াড নিয়ে। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের মিশেলে দুর্দান্তভাবে বাছাইপর্ব পেরিয়ে ফিফা র‍্যাংকিংয়ে সবার শীর্ষে থেকেই কাতারে পা রেখেছে নেইমার বাহিনী। অধরা হয়ে থাকা সেলেসাওদের হেক্সা জয়ের স্বপ্ন সত্যি করার এটাই মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছেন ফুটবল বোদ্ধারা। 

অন্যদিকে লাতিন দুই জায়ান্টের সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত ইউরোপের পাওয়ার হাউজখ্যাত জার্মানি থেকে শুরু করে টিকি-টাকার স্পেন বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সও যেকোনভাবে নিজেদের কাছে শিরোপা ধরে রাখতে চাইবে। এদিকে রুনি-বেকহ্যাম যুগের পর আবারও হ্যারি কেইন-ফিল ফোডেনদের হাত ধরে মর্ডান ফুটবলে শিরোপার স্বপ্ন দেখছে ইংল্যান্ডও। এছাড়াও গত বিশ্বকাপের মতো চমক দেখিয়ে ডার্ক হর্স হয়ে উঠতে পারে এডেন হ্যাজার্ডের বেলজিয়াম, লুকা মদ্রিচের ক্রোয়েশিয়া বা রবার্ট লেওয়ান্ডভস্কির পোল্যান্ড।

আজ থেকে মরুর বুকে শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ। লাতিন শিল্প নাকি ইউরোপের গতি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে অপেক্ষা করতে হবে ১৮ ডিসেম্বর লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামের ফাইনাল পর্যন্ত। লাতিনদের ওপর নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখে ইউরোপীয়ানরা নাকি ইউরোপের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে নিজেদের হারানো রাজত্ব ফিরিয়ে নেয় লাতিনরা সেটা দেখা যাবে লুসাইলের ফাইনালেই।

ইত্তেফাক/এসএস