সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুট

অধিগ্রহণকৃত জমি বেদখল, অসম্পূর্ণ রেল আধুনিকায়ন

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ০৪:০০

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলরুটের বেহাল অবস্থা কাটছে না কিছুতেই। গুরুত্বপূর্ণ এ রুটে ১৬টি ট্রেন চলার কথা থাকলেও চলছে ৮টি। বাকি ৮টি বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। যে কটি ট্রেন রয়েছে, সে গুলোও থাকছে বেশির ভাগ সময় নষ্ট। আছে লোকবল সংকটও। ফলে ১৩৭ বছরের পূরণ রেলপথ হারাতে বসেছে ঐতিহ্য। সরকার এই রেলপথের গুরুত্ব পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ৬৩২ কোটি টাকার ডুয়েল গেজ প্রকল্প হাতে নিলেও বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পের কাজ। তিন বছরের প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি ৮ বছরেও। 

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসন আমলে পাট রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর। দেশের দক্ষিণ অঞ্চল থেকে এই নদী বন্দরে পাট আনা নেওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ ও ১৮৮৬ সালে চার ধাপে নারায়ণগঞ্জ থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ১৪৪ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করে। এরপর নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে স্টিমারের মাধ্যমে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাটে পৌঁছানো হতো পাট। সেখান থেকে ট্রেনে করে আবার চলে যেতো কলকাতায়। কালের বিবর্তনে সেই গুরুত্বপূর্ণ পথ ঐতিহ্য হারিয়েছে। পাট আনা নেওয়ার সেই পথে এখন যাত্রীবাহী ট্রেন চলছে। সীমিত হয়েছে পথের দূরত্বও। বর্তমানে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার এই পথের দূরত্ব। বেসরকারি পরিবহন ব্যবস্থায় যাতায়াত ভাড়া ট্রেনের ভাড়ার চার গুণ। তার ওপর দ্রুত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা রয়েছে ট্রেনে। তাই যাত্রীদের পছন্দের তালিকায় সবার আগে থাকে রেলপথ।

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বমহামারি করোনা ভাইরাস শুরুর পূর্বে ২০২০ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১৬টি ট্রেন ৩২ বার আসা যাওয়া করেছে। যখন ট্রেন বৃদ্ধির কথা চলছিল, তখন উল্টো পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নারায়ণগঞ্জ স্টেশনের সূচিতে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ট্রেন চলাচল শুরু করে। চলে রাত ৮টা ৪০ পর্যন্ত। এই সময়ে মোট দুইটি ডেমুসহ ৮টি ট্রেন ১৬ বার যাতায়াত করে এখানে। শুক্রবারসহ সরকারি ছুটির দিনে চলে ৪টি ট্রেন মাত্র ৮ বার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে সকালে ও দুপুরে ডেমু ট্রেন চলাচল করে। গত ছয় মাস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ ছিল ট্রেন দুটি। গত ২২ অক্টোবর পুনরায় চালাচল শুরু করে কিন্তু সর্বশেষ গত তিন দিন নষ্ট ছিল। ৯ অক্টোবর দুপুর তিনটায় আবার ট্রেনটি চালু করা হয়েছে। 

নারায়ণগঞ্জ স্টেশন মাস্টার কামরুল ইসলাম খান জানান, ‘পুরনো ট্রেন লাইন, ডাবল ট্রেন লাইন, পদ্মা সেতু রেল সংযোগের কাজ চলমান, লোকবল ও স্টেশন মাস্টার সংকটের মতো নানা কারণে এই পথে ট্রেন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার ওপর ডেমু ট্রেন বেশির ভাগ সময়ে নষ্ট থাকায় আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তাই ডেমু ট্রেন বদলে সাধারণ ট্রেন দিলে অন্তত চাপ আরও কমে আসতো।’

জানা গেছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ আধুনিকায়নে সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারি ‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। ২০১৭ সালের জুনে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের অধীনে স্টেশনগুলো আধুনিকায়ন, ডাবল রেল লাইন করার পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরুর প্রায় ৮ বছরে ৮২.৩ শতাংশ কাজ হয়েছে। কমেছে কাজের পরিধিও। বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয় ও সময়। এখন ৬৩২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে। 

ছবি- সংগৃহীত

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই রেলপথে চাষাঢ়া রেলওয়ে স্টেশন এলাকার মাত্র দশমিক ৫১ একর বা ৩১ কাঠা জমি রেলপথটি ডাবল লাইন করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জমিটি রেলওয়েরই অধিগ্রহণ করা ছিল। এখন বেহাত হয়ে চলে গেছে ব্যক্তি মালিকানায়। এই জমি সংকটে দুই কিলোমিটার অংশ ডাবল লাইন না করে প্রকল্প সমাপ্তের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন থেকে দশমিক ৫১ একর জমি না পাওয়ায় চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েল গেজ সিঙ্গেল লাইন রেখেই প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। 

প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম রউফ জানান, ‘প্রকল্পটির আওতায় শুরুতে ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ডাবল লাইনের পরিকল্পনা করা হলেও জমি না থাকায় চাষাঢ়া পর্যন্ত হচ্ছে। চাষাঢ়া থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত হবে এক লাইনের। ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কিন্তু এখনও লাইন বিছানো বাকি। তাই ব্যয় পূর্বের অবস্থায় রেখেই সময় চেয়ে রেল মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’ 

ইত্তেফাক/এমএএম