সোমবার, ২৮ নভেম্বর ২০২২, ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

রাবি ক্যাম্পাসে পেরেকের যন্ত্রণায় হাজারো গাছ

পরিবেশবান্ধব গাছগুলো যেন একেকটি বিজ্ঞাপন বোর্ড

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২২, ১০:৩১

গাছপালায় প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে পেরেক ঠুকে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা। এছাড়া গাছে পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড-বিজ্ঞাপন লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। ২০০২ সালের ৭ জুলাই জাতীয় সংসদে এবিষয়ে একটি আইন পাস হয়।  

অথচ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে গাছগুলোতে পেরেক ঠুকে লাগানো হয়েছে শত-শত ব্যানার ও পোস্টার। এ নিয়ে প্রশাসনকেও কোনো উদ্দ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।

এবিষয়ে পরিবেশবিদরা বলেন, পেরেকের আঘাতে গাছের যে জায়গাটায় ছিদ্র হয় সেই ছিদ্র দিয়ে পচা পানি, বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও অণুজীব প্রবেশ করার ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এতে খাদ্য ও পানি শোষণপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে গাছগুলো মারা যেতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে গাছ লাগানো এবং গাছের পরিচর্যা করা প্রয়োজন, সেখানে উল্টো গাছের ক্ষতি করে চলেছে।

ছবি: ইত্তেফাক

সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেইট, কাজলা গেইট, প্যারিস রোড, টুকিটাকি চত্বর, পরিবহন মার্কেট, হলগুলোর সামনে, বিনোদপুর ও রেলস্টেশনসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছগুলোতে পেরেক ঠুকে ঝুলানো হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসকের বিজ্ঞাপন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের প্রচার-প্রচারণার অসংখ্য সাইনবোর্ড-ব্যানার, ফেস্টুনও। তাতে পিছিয়ে নেই বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কোচিং সেন্টারগুলোর প্রচারণাও। গাছগুলোর চিত্র দেখা মনে হবে একেকটি বিজ্ঞাপন বোর্ড।

এদিকে গাছে পেরেক ঠোকানো দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে তার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না থাকায় এমন অপরাধ থামছেই না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ বলেন, গাছে পেরেক ঠুকলে স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এতে তাদের ক্ষতি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রকৃতির প্রতি সহনশীলতা বাড়ানো উচিত। বৃক্ষ ছাড়া আমরা বাঁচতেই পারবো না।

ছবি: ইত্তেফাক

বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেন বলেন, গাছ আমাদেরকে অক্সিজেন নিতে সাহায্য করে। গাছে পেরেক ঠোকা মানে ও গাছ আর স্থায়ী হতে পারে না। ক্যাম্পাসের অনেক গাছ দিন দিন মারা যাচ্ছে। গাছে পেরেক ঠোকানো হলে গাছ মারাত্মকভাবে আহত হয় এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়। এক পর্যায়ে গাছগুলোকে মারা যেতেও দেখা যায়। গাছকে হত্যা করা মানে পরিবেশকে হত্যা করার সামিল। সমাজের পরিবেশ রক্ষার্থে গাছপালার কোনো বিকল্প নেই। তাই আমাদের সকলের উচিত ধ্বংস না করে গাছ লাগানো উচিত।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) রাজশাহী জেলার সমন্বয়কারী তন্ময় সান্যাল জানান, গাছের জীবন নষ্ট করার অধিকার কারোই নেই। এখানে সচেতনতার বড় অভাব রয়েছে। সরকার আইন করেছে কিন্তু আইনকে যারা বাস্তবায়ন করবে তারা সঠিকভাবে সেটা পালন করছে না। কোনোভাবেই এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশে বন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে যদি সকলকে সচেতন করা যায় তাহলে আগামী দিনে গাছ নিধন কমে আসবে মনে করছেন তিনি।

এ বিষয়ে প্রশাসনের উদ্যোগের কথা জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা এম তারেক নূর বলেন, সরকার একটি আইনের ধারাবাহিকতায় প্রশাসন থেকে উদ্যোহ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরের সকল গাছ থেকে পোস্টার-ব্যানার নামানোর জন্য আমরা অভিযান চালিয়েছিলাম। আবারও বিশেষ অভিযান চালাবো। তারপরও যদি কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা সংস্থা এই কাজটি অব্যাহত রাখে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা চাই প্রতিটি গাছ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বেড়ে উঠুক। গাছের প্রতি যত্নশীল হওয়ার জন্য তিনি সকল শিক্ষার্থীকে আহ্বান জানিয়েছেন।

ছবি: ইত্তেফাক

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আসাবুল হক ইত্তেফাককে বলেন, নীরবে গাছ আমাদের পরিবেশকে রক্ষা করে যাচ্ছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় গাছের জন্যই বেশি পরিচিত। আমরা ইতোমধ্যে লক্ষ্য করছি গাছে পেরেক ঠোকে ব্যানার ফেস্টুন লাগানোর ফলে গাছের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এমন কর্মকাণ্ড থেকে উঠে আসার জন্য শিক্ষার্থীদেরকে সচেতন করার পাশাপাশি পেরেকের পরিবর্তে বাঁশ, রশ্মি ব্যবহারে নির্দেশ দিবো আমরা। ক্যাম্পাসে পেরেক ঠোকে যেসব ব্যানার লাগানো হয়েছে তা সরিয়ে ফেলার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

ইত্তেফাক/আরএজে