রোববার, ২৭ নভেম্বর ২০২২, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

হাতবদল

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ২০:৩৮

ইচ্ছে করে ঝগড়ায় জড়ায় নমিতা। তারপর অন্য একটি গাড়িতে গিয়ে ওঠে। চান্দের গাড়ি পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকে ওপরের দিকে। তাদের সামনের গাড়ির পেছনের আসনে দেখা যাচ্ছে নবীনকে। নমিতা তাকিয়ে থাকে সেই গাড়িটার দিকে। মনে মনে তার ইচ্ছে হয়—নবীনদের গাড়িটা পাহাড় থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যাক।

ইচ্ছেকৃত ঝগড়ার বিষয়টা নবীন ধরতে পারে। নয়তো একটা তুচ্ছ কারণে আলাদা গাড়িতে উঠতে হয় না। নমিতা আসলে নতুন প্রেমিকের সঙ্গে চ্যাট করার জন্য ঐ গাড়িতে গিয়ে উঠেছে। নবীন বাধা দেয়নি। নবীন রবীন্দ্রনাথে বিশ্বাসী। সে বিশ্বাস করে, বাধা দিলে শক্তি নিজেকে চিনতে পারে, চিনতে পারলেই আর ঠেকানো যায় না। অবধারিত বিচ্ছেদ নবীন ঠেকাতে চায় না।

সাজেক ট্যুরের পরিকল্পনা চলছিল। ঠিক আগের রাতে নবীন জানতে পারে, তার স্ত্রী অন্য একটি সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। তার জীবনে এরকম অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা ঘটবে, কল্পনাও করেনি সে। ঘটনাটি প্রথম ধরে ফেলে তারেক। বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের বন্ধু বলে তাকে অবিশ্বাস করতে পারে না নবীন। আবার স্ত্রীকে নিয়ে নেতিবাচক কথায় ইন্ধনও দিতে পারে না। এক অসহনীয় শূন্যতায় দুলতে থাকে সে। আর খুব ধীর লয়ে তার মনের ভেতরটাকে বিষাক্ত করে তোলে তারেক।

‘তোদের সম্পর্কের যেন কত বছর হলো? আট না? আমাদের ফাইনাল ইয়ার, ওদের ফার্স্ট ইয়ার ...!’ নবীন মৃদু ধমক দেয়, ‘তোর ভাবি কিন্তু, শ্রদ্ধা রেখে কথা বলবি, নোংরা কথা বলবি না বলে দিচ্ছি।’

‘শ্রদ্ধা রেখেই কথা বলেছি এতদিন। কখনোই ক্যাম্পাসের জুনিয়র হিসেবে ট্রিট করিনি। বন্ধুর স্ত্রী হিসেবেই ট্রিট করেছিলাম। কিন্তু যা দেখছি, এতে আমার রাগ চেপে গেছে। খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করতেসে তোর বউকে। ঘটনা যদি সত্য হয়, তখন আর তোর বউ থাকবে না...।’

‘আমার বউ না থাকলেও তুই খারাপ ব্যবহার করতে পারিস না, খুনও করতে পারিস না! ইটস নট ইয়োর কাপ অব টি।’

নমিতাদের গাড়ি থেমে যায়। ড্রাইভারের পাশে প্যাসেঞ্জার সিটে বসেছে সে। ফোনে আর কোনো মেসেজ ঢুকছে না। তারা নেটওয়ার্কের বাইরে চলে গেছে। ড্রাইভারের আসনে বসা শিবু লুসাই গোত্রের ছেলে। বয়স ষোলো থেকে আঠারো। ভিডিয়ো গেম খেলার মতো করে গাড়ি চালাচ্ছে। গাড়ি থেমে যাওয়ায় সামনে তাকিয়ে নমিতা দেখে নবীনদের গাড়িটা ঢাল বেয়ে পেছনে আসছে। তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। নবীনদের গাড়িটা তাদের গাড়িসহ পাহাড়ের নিচে পড়ে যাবে না তো! গাড়িটা থেকে চট করে নেমে পড়ে কম বয়সি হেল্পার। চাকার নিচে একটা বেঢপ কাঠের টুকরো ফেলে গাড়িটাকে আটকে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে সেটাকে টানতে চেষ্টা করে সামনের গাড়ির চালক।

নবীন কোনো উচ্চবাচ্য করল না—ভাবে নমিতা! তবে কি সে কিছু টের পেয়ে গেছে? পেলেও তার কিছু যায় আসে না। এখন আর কিছুই করার নেই। বিয়ে করে প্রায় নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। একটা মেয়ে পড়ালেখার মধ্যে কতটা সময় ডুবে থাকতে পারে! আরেকটা পুরুষকে কেন দুজনার মধ্যে ঢোকার জায়গা করে দিল নবীন?

নবীন বসেছে গাড়ির পেছনে। সেখান থেকে পেছনের গাড়িতে নমিতাকে দেখা যাচ্ছে। চেষ্টা করছে যেন দুজনার চোখাচোখি হয়। নমিতা সহযোগিতা করছে না। চোখাচোখি হচ্ছে। নবীন পুরাতন মেসেজ খুলে পড়তে থাকে। তারেকের মেসেজ—‘বিষয়টাকে আর এগোতে দিস না। ভালো কোচিংয়ে পড়ালি, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় টিকালি, চাকরিও হলো, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি নিতে যাচ্ছে। অথচ সঙ্গে প্রেমিক! এটা মেনে নেওয়া যায়? বন্ধ কর, প্রতিশোধ নে!’

নবীন প্রতিশোধের কথা ভাবে না। ভাবে ট্যুরে গিয়ে কথাবার্তা বলে সবকিছু মিটিয়ে নেবে। মানুষের মন, ভুল করতেই পারে। প্রেমিকা হলে সম্পর্ক ছিন্ন করা যেত, স্ত্রীর সঙ্গে তো সম্পর্ক ছিন্ন করা এত সহজ না। কিন্তু নমিতা একটা কথাও বলে না। কোনো রাগারাগি নেই, কথাও নেই। কেবল বলেছে, ‘আমাকে একটু নিজের মতো থাকতে দাও।’ সারাটা পথ সে নিজের মতো চ্যাট করেছে।

নিঃসঙ্গ নমিতা সব পেয়েছিল, কেবল স্বামী তাঁকে সময় দেয়নি। আর সেই অসময়ে দুজনের মধ্যে ঢুকে পড়ে তৃতীয় জন। নমিতাকে আগলে রাখার ভান করতে করতে প্রেমে জড়িয়ে যায় দুজন। সাজেক থেকে ফিরেই ওরা চলে যাবে যুক্তরাষ্ট্রে। একই বিমানে যাবে, একই বাড়িতে উঠবে। দুজন ভর্তি হবে দুটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

সাজেকে পৌঁছে নবীনের রাগ বাড়ে। একবার মনে হয় বউকে পাহাড় থেকে ফেলে দেবে। একবার মনে হয় তাতে শাস্তিটা কম হয়ে যাবে। নিজ হাতে গলা টিপে মেরে তারপর ফেলে দেবে। কটেজে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে প্রথম কথা বলে নবীন, ‘খুব জরুরি একটা কথা, ঢাকায় থাকতেই বলতাম, এখন বলব। চলো, খাওয়া শেষ করে বলি।’

নমিতা করুণামাখা দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এখানে বলো।’

নবীন তার কাছে এগিয়ে দাঁড়ায়। একেবারে মুখোমুখি। পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় দুজন শুনতে পায় দুজনার নিশ্বাসের শব্দ। নবীন বলে, ‘আমাদের সঙ্গে যারা এসেছে, তাদের কিছু বুঝতে না দিলে ভালো হয়। যেহেতু ফোনে নেটওয়ার্ক নেই, যেহেতু এটাই আমাদের শেষ ট্যুর, চলো ট্যুরটাকে আরো তিক্ত করে ফেলি, যাতে সারা জীবন দুজনের প্রতি দুজনের ঘৃণা না ফুরায়।’

বাঁশের খোলে রান্না করা মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেতে খেতে তেমন কথা হয় না তাদের। চা খেতে খেতেও তেমন কথা হয় না। ‘মাংসে লবণ হয়েছে’, ‘চায়ে চিনি হয়েছে’ জাতীয় আলাপের পর নমিতাকে হাত ধরে টেনে রাস্তার ধারে নিয়ে যায় নবীন। সেখানে আলো নেই, মানুষও নেই। সামনে তাকালে কেবল সবুজাভ অন্ধকারের ঢেউ।

নমিতার কোমর জড়িয়ে ধরে নবীন বলে, ‘এই কষ্টটা আমি সহ্য করতে পারব না।’

নমিতা বিস্মিত চোখে বলে, ‘কোনটা?’

নবীন বলে, ‘তোমাকে আরেকটা পুরুষ আদর করবে, সেটা। তুমি বরং আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দাও। লাশ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তুমিও নতুন সম্পর্কটাকে জাস্টিফাই করতে পারবে।’ কোমর থেকে নবীনের হাত উঠে আসে নমিতার কাঁধে। নমিতা কাঁধ থেকে হাতটা সরিয়ে বলে, ‘আমি তোমাকে খুন করতে চাই না। কেবল চাই, তুমি ভালো থাকো। আমাকে ভালো থাকতে দাও।’

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন