শুক্রবার, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ব্রিটিশ আমলের ঈশ্বরদী জংশন ষ্টেশনে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২২, ১৪:৪৬

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ব্রিটিশ আমলের বৃহত্তম ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনে শত বছরেও আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি। নানা সমস্যায় জর্জরিত পুরাতন এই স্টেশনটি। চারটি প্লাটফর্মের আশপাশে মলমূত্রের দুর্গন্ধে সবসময় অস্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজমান। যাত্রী সেবার নেই ন্যুনতম সুবিধা। শতবর্ষী এ স্টেশনের চারটি প্লাটফর্মের কোনোটিতেই নেই বৈদ্যুতিক ফ্যান। প্লাটফর্মের টিউবওয়েল নষ্ট, বাথরুমের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। স্টেশনটিকে ঘিরে রয়েছে পকেটমারদের দৌরাত্ম। পদ্মা নদীর উপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গেই গোড়াপত্তন ঘটে ঈশ্বরদী জংশনের। ব্রিটিশের পর পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের অর্ধ শতাব্দী পেরলেও উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনে চারটি প্লাটফর্ম রয়েছে। শৌচাগার রয়েছে একটিতে। একটি টিউবওয়েল থাকলেও সেটি নষ্ট। এতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীরা।

জানা যায়, ৩২টি যাত্রীবাহী ট্রেন প্রতিদিন এ স্টেশনের ওপর দিয়ে চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় হাজার হাজার যাত্রী এই ষ্টেশনের উপর দিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করে। ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রীদের তীব্র গরমে পোহাতে হয় দুর্ভোগ। রেল কর্তৃপক্ষ শত বছরেও প্লাটফর্মে যাত্রী সেবায় ফ্যানের ব্যবস্থা না করায় যাত্রীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। সুবিশাল এলাকা নিয়ে ঈশ্বরদী জংশনে রয়েছে বিশাল আকারের সান্টিং ইয়ার্ড। ভারত থেকে আমদানিকৃত মালামাল সহ দেশের অভ্যস্তরে রেলওয়েতে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ঈশ্বরদী জংশন ষ্টেশন ব্যবহার করা হয়। পণ্য পরিবহনের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই ঈশ্বরদীতে ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানে শিল্প প্রতিষ্ঠার মূল কারণ শিল্পের আমদানিকৃত কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্য কম খরচে রেলওয়েতে পরিবাহিত হওয়া। এই ষ্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে বড় কন্টেইনার ইয়ার্ড। আধুনিকীকরণ না হওয়ায় ষ্টেশন দিয়ে চলাচলরত যাত্রীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

সম্প্রতি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের রেল লাইন স্থাপনের সময় প্রকল্পের অর্থায়নে স্টেশনের ৪টি প্লাটফর্ম উঁচু ও সম্প্রসারিত করা হয়। প্লাটফর্ম উঁচু করার ফলে ষ্টেশনের ব্রিটিশ আমলে নির্মিত সবকটি অফিসের মেঝে এখন অনেক নীচে।  ৩ ও ৪ নং প্লাটফর্মের সম্প্রসারিত অংশে ছাউনি নেই। রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে এ অংশে যাত্রীদের ট্রেনে উঠানামা করতে হয়। প্লাটফর্মের নিচে রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মলমূত্র। যাত্রী বিশ্রামাগারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের বিশ্রামাগারের অবস্থা শোচনীয়। শৌচাগারের দুর্গন্ধে যাত্রীরা বিশ্রামাগার ছেড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।  ৩ ও ৪ নম্বর প্লাটফর্মের টিনসেড ছাউনি সম্প্রতি বদলানো হলেও ১ ও ২ নং প্লাটফর্মের ছাউনির (ছাদ) দিকে তাকালেই চোখে পড়ে ছোট-বড় অসংখ্য ছিদ্র ছিল। সামান্য বৃষ্টিতেই প্লাটফর্ম পানিতে ভেসে যায়।

স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রী রাকিবুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ট্রেন এক ঘণ্টা বিলম্বে আসছে। ভাবতে অবাক লাগে বৃহৎ স্টেশনের প্লাটফর্মে ফ্যান নেই, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও মানসম্পন্ন ওয়াশরুম নেই।

আরেক যাত্রী হারুনর রশীদ বলেন, প্লাটফর্মে যাত্রীদের বসার ভালো ব্যবস্থাও নেই। ওয়াশরুম ও পানির ব্যবস্থা নেই। তিনি আরও বলেন, ছোট ছোট স্টেশনের প্লাটফর্মে ফ্যান থাকলেও অন্যতম বড় এ স্টেশনে ফ্যান নেই। যা খুবই আশ্চর্য মনে হচ্ছে।

স্থানীয় বণিক সমিতির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, বর্তমান সরকার রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই স্টেশনে সেবার মান না বেড়ে সমস্যা বাড়ছে।

সাবেক কমিশনার মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান ফান্টু বলেন, ইতিপূর্বে  জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন দফায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনী জনসভায় ঈশ্বরদী ষ্টেশন রি-মডেলিং এর দাবী বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও দীর্ঘ সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এই স্টেশন দিয়ে পার্শ্ববর্তী নাটোরের লালপুর, পাবনা, আটঘোরিয়াসহ বিভিন্ন দূর দূরান্তের যাত্রীরা চলাচল করেন।  শৌচাগারের দুর্গন্ধে যাত্রী বিশ্রামাগারে বসা যায় না। তাই দুর্গন্ধ থেকে রক্ষার জন্য তাঁর মত অনেক যাত্রী বিশ্রামাগারে না বসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে বৃহত্তম এই স্টেশনে যাত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত টিকিটের সংখ্যা একবারেই নগণ্য। টিকিট বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবী জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এ স্টেশনে কলকাতাগামী ‘মৈত্রি এক্সপ্রেস’ ট্রেনের যাত্রী বিরতি থাকলেও যাত্রী পরিবহনের সুযোগ নেই। মৈত্রি এক্সপ্রেসে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টির জন্য তিনি দাবী জানিয়েছেন।  

স্টেশন সুপারিন্টেনডেন্ট মহিবুল ইসলাম জানান, ফ্যান, বাথরুম ও খাওয়ার পানি সমস্যার বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না। আমাদের ঊর্ধ্বতন স্যাররা রয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসা করুন। আমার এ বিষয়ে কথা বলার কোনো অনুমতি নেই।

পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী রিফাত শাকিল রুম্পা বলেন, পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক স্যারসহ রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্টেশনের প্লাটফর্মে বৈদ্যুতিক ফ্যান না থাকার বিষয়টি জানেন। স্টেশনে ফ্যান লাগানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বাজেট বরাদ্দ এলেই ফ্যান লাগানো হবে। তবে আগের চেয়ে বর্তমানে স্টেশন প্লাটফর্মের পরিবেশ অনেক ভালো। তবে, ট্রেন প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেক যাত্রী ট্রেনে মলমূত্র ত্যাগ করায় পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এ কারণেই দুর্ভোগ বলে জানান তিনি।

পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় প্রকৌশলী (ডিএন-২) বীরবল মণ্ডল বলেন, টিউবওয়েল মেরামত করে দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য যে সমস্যা রয়েছে সেগুলো খুব শিগগির সমাধান করা হবে।

রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ম্যানেজার (ডিআরএম) নূর মোহাম্মদ জানান, ঈশ্বরদী জংশন স্টেশন আধুনিকায়নের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের পরিকল্পনা মাফিক হয়। আমি মাত্র ২ মাস এখানে এসেছি। এবিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।

পশ্চিামাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার ইত্তেফাককে জানান, ঈশ্বরদী জংশন ষ্টেশন আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থায়নের কারণে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।

ইত্তেফাক/এআই