মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

গীতা জয়ন্তী: স্বাধীনতা আন্দোলন ও আধুনিক ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তাচেতনার পথপ্রদর্শক

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৫:২৪

এ বছর ৩ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে গীতা জয়ন্তী। গীতা জয়ন্তী হলো শ্রীমদভগবদগীতার আবির্ভাবের দিন। এই দিনেই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে গীতাজ্ঞান প্রদান করেছিলেন।

তবে এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, ভগবদগীতা যেভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছে, সে বিষয়ে বিভিন্ন দেশে পাঠ্যপুস্তকে খুব কম আলোচনাই রয়েছে। জনজীবনে মার্কসবাদী চিন্তাচেতনা ঢুকে পড়ায় অনেকেই গীতাকে শুধুমাত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে দেখে থাকে। তবে ভগবদগীতা হলো এক বিপ্লবী গ্রন্থ যা ভারতের ইতিহাসে এক নব জাগরণ ঘটায়। 

ভগবদগীতার আক্ষরিক অর্থ হলো "পরমেশ্বরের গান"। এটি বিশ্বের সর্বাধিক পরিচিত বৈদিক শাস্ত্র। সংস্কৃতে রচিত এ শাস্ত্রের ১৮ টি অধ্যায় এবং ৭০০ টি শ্লোক রয়েছে। এ শাস্ত্রকে বৈদিক জ্ঞানের সারমর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই লেখা অসংখ্য ভাষায় অনূদিত ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক এবং শ্রী অরবিন্দ এই শাস্ত্রের দুইটি উল্লেখযোগ্য ভাষ্য প্রদান করেন। উভয় ভাষ্যই আমাদের জাতির দিকনির্দেশনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

১৯ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রাজনৈতিক মঞ্চে তিলকের প্রবেশের আগে তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভারতীয়দের মন থেকে পাশ্চাত্য মতাদর্শের প্রভাব কমাতে হবে। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই পাশ্চাত্য মতাদর্শের প্রভাবের ফলে স্বাধীনতা সংগ্রাম বেশিদূর অগ্রসর হতে পারবে না।

ভারতীয় চিন্তাধারার উপর পাশ্চাত্য মতাদর্শের আধিপত্যকে মোকাবিলা করার জন্য তিলকের ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হিন্দু চিন্তাধারার এমন এক দর্শনের প্রয়োজন ছিল যা সর্বকালের, সর্বযুগের মানুষের পথপ্রদর্শক হবে, যা হিন্দুধর্মকে পুরনো চিন্তাধারা থেকে মুক্ত করে সামাজিক কর্মের ভিত্তি হিসেবে পাশ্চাত্য ধারণাগুলোকে প্রতিস্থাপন করবে।

ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের তিনি এই দর্শনের মাধ্যমে আলোড়িত করে তাদের দ্বারাই জনসাধারণকে উজ্জীবিত করে ব্রিটিশ সরকারের ভীতকে নাড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। এ কাজে তিনি বিশেষভাবে উপযুক্ত হিসেবে বেছে নেন ভগবদগীতাকে।

তিলক এই শাস্ত্রকে ধর্মগ্রন্থের পরিমণ্ডল থেকে বের করে এনে এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় রূপ দিতে চেয়েছিলেন যা সরাসরি জনসাধারণের মনে জাতীয়তাবাদ জাগরিত করবে। বার্মার মান্দালয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় তিনি তার ভাষ্য "গীতা-রহস্য" লিখে গীতাকে এক নবরূপ প্রদান করেন।

অধ্যাপক ব্রাউন এ বিষয়ে গবেষণা করে বলেন যে, তিলক তাঁর ভাষ্যে দুইটি বিষয় খুব সুন্দর করে প্রমাণ করেছেন।

১. গীতা মূলত ত্যাগ বা ভক্তির পরিবর্তে কর্মের দর্শনের পক্ষে কথা বলে।

২. জাতি যখন অভ্যন্তরীণ ক্ষয় বা বাহ্যিক নিপীড়নের দ্বারা হুমকির মুখে পড়ে তখন সামাজিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ সকল নাগরিকের কর্তব্য।

ভারতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে "গীতা-রহস্য" এর প্রভাব বিশেষ করে জাতীয়তাবাদীদের আধুনিক ভারতীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা গঠনের ক্ষেত্রে অসাধারণ ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনসংঘ এবং পরবর্তীতে ভারতীয় জনতা পার্টির মতো দলগুলোর দ্বারা এ উত্তরাধিকার এগিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং এটি নরেন্দ্র মোদি সরকারের কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হয়।

অন্যদিকে অরবিন্দ ভগবদগীতার উপর তার ভাষ্যের মাধ্যমে 'আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদ' ধারণাটি উত্থাপন করেছিলেন।

তার মাসিক পত্রিকা "আর্য" তে তিনি গীতার উপর তাঁর প্রবন্ধকে দুইটি সিরিজে প্রকাশ করেন - ১৯১৬ এর আগস্ট থেকে ১৯১৮ এর জুলাই এবং ১৯১৮ এর আগস্ট থেকে ১৯২০ সালের জুলাই পর্যন্ত। তিনি ৪৮ টি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। পরে সেগুলোকে পরিমার্জিত করে বই আকারে প্রকাশ করা হয়। ১৯৫০ সালে এই দুইটি সিরিজ এক খণ্ডে প্রকাশিত হয়।

অরবিন্দ সহজেই অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, ভগবদগীতা সহজেই জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। অরবিন্দ অনুভব করেছিলেন যে জাতীয়তাবাদ কোন নিছক রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং একটি ধর্ম, যেটি স্বয়ং ঈশ্বর প্রদত্ত। তিনি গীতার সমস্ত সমসাময়িক ব্যাখ্যাকে কর্মযোগী ব্যাখ্যা হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সেইসাথে তিনি ভারতের প্রাচ্যবাদী ভাবমূর্তিকে প্রাথমিকভাবে একটি আধ্যাত্মিক রাজ্য হিসাবে পুনরুৎপাদন করতে চেয়েছিলেন।

গীতার এই প্রবন্ধগুলি সম্ভবত অরবিন্দের দর্শনের কেন্দ্রীয় বিষয়গুলির সবচেয়ে পদ্ধতিগত অভিব্যক্তি। তাঁর সময়ের অনেক জাতীয়তাবাদী লেখকের মতো তিনিও তাঁর নিজস্ব ধারণা গঠনের জন্য গীতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম অনুভব করেন যে ভারতে ব্রিটিশ শাসন সম্পূর্ণরূপে নাস্তিক, বস্তুবাদী এবং উপযোগবাদী ছিল, যার মধ্যে আধ্যাত্মিকতার কোনো মূর্তি ছিল না।

অন্য কথায়, ব্রিটিশদের উৎখাত ভারতের আধ্যাত্মিক মর্ম পুনরুদ্ধারের দিকে পরিচালিত করবে। তাই জাতীয়তাবাদ শুধুমাত্র একটি আর্থ-সামাজিক মুক্তি নয়, এটি একটি আধ্যাত্মিক মুক্তিও। অরবিন্দ ভেবেছিলেন যে ভারতের আধ্যাত্মিক পুনরুজ্জীবন সমগ্র বিশ্বে এমন একটি চেতনাকে উদ্বুদ্ধ করবে।

অরবিন্দের আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় সাম্প্রতিককালে মোদী সরকারের দ্বারা হিন্দুদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলো যেমন, বারাণসী, কেদারনাথ, উজ্জয়িনী, অযোধ্যা ইত্যাদি পুনরুজ্জীবনে। যারা এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেন তারা হয়তো ভুলে গেছেন যে মোদী সরকার আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদের চেতনায় উজ্জীবিত।

ভগবদগীতার উপর তিলক এবং অরবিন্দের ভাষ্যগুলো হলো জাতির মনোভাব বুঝার এবং ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতা গ্রহণের পর যে মৌলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তার নির্দেশিকাস্বরূপ। এই ভাষ্যগুলো ব্রিটিশ আমল থেকেই জাতির পথপ্রদর্শকের কাজ করে আসছে। গীতাকে শুধুমাত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা এর চেতনার প্রতি এক গুরুতর অবিচার করা হবে, গীতা মূলত আমাদের জাতির আত্মাস্বরূপ।

ইত্তেফাক/এসআর