মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ১৭ মাঘ ১৪২৯
দৈনিক ইত্তেফাক

ইসলামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষানীতি

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১০:১৫

আধুনিক বিশ্বে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার বিষয়টি বর্তমানে বেশ আলোচিত। নানাবিধ সুবিধার কারণে মানুষের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং প্রযুক্তির নানা সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ছে। এসব সরঞ্জাম ব্যবহারকালীন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার নিশ্চয়তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দিলেও বর্তমানে ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ আর গোপন থাকছে না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন থাকলেও নানাবিধ কারণে তা শতভাগ কার্যকর নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তার তথ্য ফাঁস মানে ব্যক্তির তথ্য অধিকার খর্ব করা, যা আইন ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে জঘন্য অমার্জনীয় অপরাধ।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি কখনোই অন্য কোনো ব্যক্তির গোপনীয়তা, পারিবারিক বিষয়, বাসস্থান বা যোগাযোগে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এমনকি আত্মসম্মান নষ্ট হয় এমন কোনো পদক্ষেপও নিতে পারবে না। এরকম হস্তক্ষেপ বা আক্রমণের বিরুদ্ধে আইন সুরক্ষিত করতে প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (International Covenant on Civil and Political Rights) ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ, জাতিসংঘের কনভেনশন অন মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারসের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জাতিসংঘের শিশু সুরক্ষা সনদের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে ‘অধিকার’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ইসলাম ব্যক্তির গোপনীয়তা সুরক্ষার ব্যাপারে তার অনুসারীদের জোর তাগিদ দিয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত। পবিত্র কোরআন মাজিদে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কতক ধারণা গোনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান কোরো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (সুরা হুজরাত:আয়াত:১২)। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতের উল্লেখিত আয়াতে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। (এক) প্রবল ধারণা (অসত্ উদ্দেশ্যে, মন্দ ভাবনায়), (দুই) কারো কোনো গোপন দোষ সন্ধান করা এবং (তিন) গিবত করা। ইসলামে এ তিনটি বিষয় স্পষ্টত হারাম।

যেসব মুসলিম বাহ্যিক অবস্থার দিক দিয়ে সত্কর্মপরায়ণ দৃষ্টিগোচর হয়, তাদের সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া কুধারণা পোষণ করা হারাম। রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, ধারণা মিথ্যা কথার নামান্তর।’ (সহিহ বুখারি:৪০৬৬, মুসলিম:২৫৬৩)।

উপরোক্ত আয়াতে আলোচিত দ্বিতীয় নিষিদ্ধ বিষয় হচ্ছে, কারো দোষ সন্ধান করা, যাকে আমরা ‘ব্যক্তিগত গোপনীয়তা’ বুঝি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশ করার দ্বারা নানা রকম ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়। এ কারণে একবার নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার খুতবার দোষ অন্বেষণকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘হে সেই সব লোকজন, যারা মুখে ইমান এনেছ, কিন্তু এখনো ইমান তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করেনি, তোমরা মুসলিমদের ‘গোপনীয়’ বিষয় খুঁজে বেড়িও না। যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ-ত্রুটি তালাশ করে বেড়াবে, আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটির অন্বেষণে লেগে যাবেন। আর আল্লাহ যার ত্রুটি তালাশ করেন, তাকে তার ঘরের মধ্যে লাঞ্ছিত করে ছাড়েন।’ (সুনানে আবু দাউদ :৪৮৮০)। মুআবিয়া (রা.) বলেন, ‘আমি নিজে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘তুমি যদি মানুষের গোপনীয় বিষয় জানার জন্য পেছনে লাগো। তাদের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করবে কিংবা অন্তত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে।’ (সুনানে আবু দাউদ:৪৮৮৮)। অন্য এক হাদিসে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘মুসলিমদের গিবত কোরো না এবং তাদের দোষ অনুসন্ধান কোরো না। কেননা, যে ব্যক্তি মুসলিমদের দোষ অনুসন্ধান করে, আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন। আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন, তাকে স্ব-গুহেও লাঞ্ছিত করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ :৪৮৮০)।

এ ক্ষেত্রে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ ঘটনা অতীব শিক্ষাপ্রদ। একবার রাতের বেলা তিনি এক ব্যক্তির কণ্ঠ শুনতে পেলেন। সে গান গাইতেছিল। তার সন্দেহ হলো। তিনি তার সাথি আবদুর রহমান ইবন আওফ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ঘরটি কার? বলা হলো, এটা রবিআ ইবন উমাইয়া ইবন খালফের ঘর। তারা এখন শরাব খাচ্ছে। আপনার কী অভিমত? অতঃপর আবদুর রহমান ইবন আওফ বললেন, আমার অভিমত হচ্ছে যে, আমরা আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা-ই করে ফেলছি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তা করতে নিষেধ করে বলেছেন, ‘তোমরা গোপন বিষয় অন্বেষণ কোরো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত :১২)। তখন ওমর ফিরে এলেন এবং তাকে ছেড়ে গেলেন। [মুস্তাদরাকে হাকিম :৮২৪৯, মাকারিমুল আখলাক: আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল খারায়েতি:৩৯৮, ৪২০, মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক :১০/২২১)। এ থেকে প্রমাণিত হয়, খুঁজে খুঁজে মানুষের গোপন দোষ-ত্রুটি বের করা এবং তারপর তাদের পাকড়াও করা শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, ইসলামি সরকারের জন্যও জায়েজ নয়। একটি হাদিসেও এ কথা উল্লেখিত হয়েছে। উক্ত হাদিসে নবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘শাসকেরা যখন সন্দেহের বশে মানুষের দোষ অনুসন্ধান করতে শুরু করে, তখন তা তাদের চরিত্র নষ্ট করে দেয়।’ (সুনানে আবু দাউদ :৪৮৮৯)। উল্লেখ্য, বর্তমান আধুনিক বিশ্বে জননিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিশেষ প্রয়োজনে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যক্তিবিশেষকে নজরদারির আওতায় আনা কিংবা কোনো তথ্য সংগ্রহ করা আইন ও ধর্মবিরোধী নয়।

ইসলাম ধর্মে ব্যক্তির মান-মর্যাদা সুরক্ষার বিষয়ে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আমানত রক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কোনো মুসলমান ভাইয়ের দৃষ্টিতে অপর মুসলমান ভাইয়ের দোষত্রুটি পরিলক্ষিত হলে সে ক্ষেত্রে কর্তব্য হলো উক্ত দোষ-ত্রুটি গোপন করা, জনসম্মুখে প্রকাশ করে তাকে হেয় বা লাঞ্ছিত না করা। এ বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি হলো, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবি (স.) বলেছেন, ‘এক মুমিন আরেক মুমিনের আয়না ও ভাই।’ (আবু দাউদ, হাদিস:৪৯১৮)।

লেখক: মুহাদ্দিস, নোয়াখালী কারামাতিয়া কামিল মাদ্রাসা, সোনাপুর, সদর, নোয়াখালী

ইত্তেফাক/কেকে

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন