আরেকটি বড় জনস্রোত দেখল রাজধানীবাসী। গতকাল শুক্রবার বিকালে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সমাবেশে লাখো মানুষের ঢল নামে। সমাবেশস্থল ছিল মহানগর নাট্যমঞ্চ। কিন্তু সকাল থেকেই নেতাকর্মীরা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কার্যালয় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আসতে থাকেন। জুমার নামাজের পরে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় আশপাশের এলাকা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে শুরু করে মতিঝিলের দৈনিক বাংলা মোড়, গুলিস্তান ফুলবাড়ী, গুলিস্তান মহানগর নাট্যমঞ্চ ও এর আশপাশের এলাকায় নেতাকর্মীদের ঢল নামে। বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, নৈরাজ্য, অপরাজনীতি ও অব্যাহত দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। পুরো সমাবেশস্থল ও এর আশপাশের অনেক এলাকায় উপস্থিত নেতাকর্মীরা বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এর মাধ্যমে রাজধানীতে সাংগঠনিক শক্তির বড় ধরনের শোডাউন দেখাল আওয়ামী লীগ।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপির আজকের সমাবেশ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তারা (বিএনপি) থাকবে গোলাপবাগে, মানুষ কেন আতঙ্কিত হবে? জনগণকে বলব, আতঙ্কের কারণ নেই। আমরা চলে যাচ্ছি কাল (আজ) সাভারে। ঢাকায় আমরা নাই। তিনি আরও বলেন, বিএনপিকে এই শহর (ঢাকা শহর) দিয়ে গেলাম। আতঙ্ক কেন? আমরা ক্ষমতায়। আমরা কেন অশান্তি চাইব? আমরা কেন বিশৃঙ্খলা করব? নির্বাচনের আরও এক বছর বাকি আছে। নির্বাচনে খেলা হবে, ইনশাআল্লাহ। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি নয়াপল্টন ছেড়ে শেষ পর্যন্ত গোলাপবাগে গেছে। এতে তাদের অর্ধেক পরাজয় হয়ে গেছে। তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলে, কেউ বাধা দেবে না। তবে সমাবেশের নামে কোনো ধরনের নৈরাজ্য, নাশকতা বা অতীতের মতো অগ্নিসন্ত্রাসের পথে গেলে ন্যূনতম ছাড় দেওয়া হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেই সকল অপশক্তিকে মোকাবিলা করা হবে। ঢাকাসহ দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, আতঙ্কের কিছু নেই। আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি। ওরা (বিএনপি) যদি কোনো জায়গায় হাত দেয়, সেই হাত ভেঙে ও গুঁড়িয়ে দিতে হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি বলে, সরকার নাকি ভয় পেয়েছে। মহানগর নাট্যমঞ্চে সভা, এদিকে গুলিস্তান, বঙ্গভবনের আশপাশ এলাকায় লোকে লোকারণ্য। কাদের পরাজয় হলো? তিনি বলেন, ঢাকা সিটিতে বের হয়ে বুঝতে পারলাম আওয়ামী লীগ প্রস্তুত। আমাদের নেত্রীর ডাকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরা প্রস্তুত আছে।
সেতুমন্ত্রী বলেন, আমি দুই দিন আগে বলেছি মেঘ চলে যাবে। বিএনপি শেষ পর্যন্ত সমাধানে আসবে। পল্টন থেকে ভেবেছিলাম বাংলা কলেজ, না হলে গোলাপবাগ। অবশেষে মেনে নিয়েছে, তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, তৈরি হয়ে যান, প্রস্তুত হয়ে যান। যারা সহস্র জননীর বুক খালি করেছে, যারা গ্রেনেড হামলা করেছে, যারা জেল হত্যা করেছে, যারা জয় বাংলা নিষিদ্ধ করেছে, যারা মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ নিষিদ্ধ করেছিল, যারা স্বাধীনতার ভাষণ নিষিদ্ধ করেছিল, যারা হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার করেছে, আমেরিকা সিঙ্গাপুরে ধরা খেয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে খেলা হবে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক নয়াপল্টনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বিবৃতি প্রদানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কানাডার আদালত বলেছে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল। বিএনপির কোনো সদস্যকে কানাডা আশ্রয় দিতে পারে না। বৃহস্পতিবার সে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে এক জন রাষ্ট্রদূত বিবৃতি দিয়েছেন। আমি জিজ্ঞাসা করি রাষ্ট্রদূতকে, কোন কূটনৈতিক আচার-আচরণে, রীতিনীতিতে আপনারা একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিবৃতি দিলেন? এটি আপনারা দিতে পারেন না। এ ধরনের বিবৃতি ভবিষ্যতে দেবেন না বলেই প্রত্যাশা করি।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক ঢাকাবাসীকে অভয় দিয়ে বলেন, প্রিয় ঢাকাবাসী, আতঙ্কের কিছু নেই। আপনাদের সঙ্গে আমরা আছি। ওরা (বিএনপি) যদি কোনো জায়গায় হাত দেয়, সেই হাত ভেঙে ও গুঁড়িয়ে দিতে হবে। ফজরের নামাজ পড়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাহারা দিতে হবে। কোথাও যেন ওরা উচ্চবাচ্য করতে না পারে। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আর কে আবদুর রহমান বলেন, বিএনপিকে বলব এখনো সময় আছে, সোজা পথে আসেন। আঙুল বাঁকা করতে হলে আপনাদের পাকিস্তানে চলে যেতে হবে বা কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারে পাঠাতে হবে। অন্য রাজনৈতিক শক্তির জায়গা এ দেশে হতে দেব না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা রাজপথে থাকবে বলে জানিয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, যারা হুঙ্কার দেয় যে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়া করবে, সরকারের পতন করে ফেলবে। ১০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো নেতাকর্মী যেন রাস্তায় না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় পাহারা দিতে হবে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, মির্জা আজম, এস এম কামাল হোসেন, আফজাল হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, যুবলীগ চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস প্রমুখ।
মহানগর নাট্যমঞ্চে এ সমাবেশের আয়োজন করা হলেও দুপুর থেকেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে মানুষের ঢল নামে। হাজার হাজার মিছিলে পুরো নাট্যমঞ্চ নেতাকর্মীতে পূর্ণ হয়ে আশপাশের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে।
এদিকে আজ শনিবার দুপুর ২টায় সাভারের রেডিও কলোনি মাঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচারের প্রতিবাদে এই জনসভার আয়োজন করেছে সাভার উপজেলা, ধামরাই উপজেলা, সাভার পৌরসভা ও আশুলিয়া থানা আওয়ামী লীগ।
