মিউজিক্যাল ড্রামা: দ্য লাভ সংস

কমেডির ভেতর দিয়ে প্রবাস জীবন দেখা

আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০২২, ২৩:৫১

মহব্বতজান চৌধুরী ও শেহেরজান মেইনল্যান্ড ইউরোপের বাসিন্দা ছিলেন দীর্ঘ সময়। গত এক-দেড় দশক ধরে ইউরোপে বাস করা বাঙালিদের বিলেতমুখী যে স্রোত, সেই স্রোতের অংশ হয়েই পূর্ব লন্ডনে তরি ভিড়িয়েছেন এই দম্পতি। এদের আচার-আচরণ কর্মকাণ্ড দেখে মনে হতে পারে, সেখানকার বাঙালি কমিউনিটি যেন এক ছোটখাটো বঙ্গদেশীয় গ্রাম। গ্রাম এই অর্থে যে, এখানে গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও কূপমণ্ডকতা দুইয়েরই দেখা মেলে। যদিও শেহেরজানের প্রতিদিনকার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে সোশ্যাল মিডিয়া; রয়েছে ফেইসবুক লাইভের মাধ্যমে আত্মপ্রচারের স্থূল অভিলাষ। নিজেকে সে মেলে ধরতে চায়। খ্যাতির মোহ তাকে উন্মাদ করে তুলেছে। 

মহব্বতজানের অবস্থা অবশ্য আরো শোচনীয়। ভবঘুরে স্বভাবের মানুষ সে। ব্রিটেনের মহান (!) বেনিফিট সিস্টেম তাকে কর্মবিমুখ এক বাচাল হিসেবে জীবনযাপনের সুযোগ করে দিয়েছে। মহব্বত আর শেহেরজানের একমাত্র কন্যা জহরত আরা। বাঙালি সংস্কৃতিকে ধারণ করার নামে বাবা-মার অন্তঃসারশূন্য ও বিরক্তিকর কর্মকাণ্ডে যারপরনাই বিরক্ত সে। ছোটবেলায় গান শিখলেও যত্রতত্র পারফর্ম করার বিষয়টি চাপিয়ে দেওয়ার কারণে ‘বাঙালিয়ানা’র ব্যাপারে একধরনের মোহভঙ্গ হয় তার। বহুবছর পর, হঠাত্ একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া জহরত বাবার ইউটিউবের প্লেলিস্টে বাজতে থাকা একটি ফোক গানের সুর শুনে চমকে ওঠে। লিরিক্সের অর্থ জানতে চায় বাবার কাছে। মহব্বত তার আধো ইংরেজি আধো বাংলায় মেয়েকে লালনের ঐ গানটির স্পিরিচুয়াল আসপেক্ট বোঝাতে চেষ্টা করে। জহরত খানিকটা বুঝতে পারে, খানিকটা পারে না; আবার কিছুটা বুঝে নেয় গুগল ট্রান্সলেটরের সাহায্যে। গানের টিউন আর পাওয়ারফুল লিরিক্স তার মনোজগতে ঝড় তোলে। এক ধরনের রূপান্তর ঘটে তার, যাকে বলা যায় সাংস্কৃতিক রূপান্তর। 

জহরত বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে তার প্রিয় ফোক গানগুলোর ইউটিউব লিঙ্ক শেয়ার করতে থাকে। বিস্তার ঘটতে থাকে বাংলাগানের এবং বন্ধুমহলে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে সেগুলো। এক পর্যায়ে স্টুডেন্টস’ ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টকে রাজি করিয়ে দারুণ এক ফোক ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করে জহরত ও তার বন্ধুরা। কমেডির ভেতর দিয়ে প্রবাসজীবন দেখার এই কাহিনি নিয়ে লন্ডনের নাট্যোত্সবে মঞ্চস্থ হয়েছে মিউজিক্যাল কমেডি ‘দ্য লাভ সংস’। শেষ অঙ্কে সত্যিকারের কনসার্টের আবহ দিয়ে শেষ হয় মঞ্চনাটকটি। 

ফেসবুক লাইভে আসক্ত টেলিভিশন স্টার হতে চাওয়া শেহেরজানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দীপ্তি অনুপম। পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান নিয়ে মহল্লা কাঁপানো মহব্বতজানকে জীবন দিয়েছেন হাসান হাফিজুর রহমান পলক। বাবা-মায়ের হাইব্রিড জীবনযাপনকে দূরে ঠেলে দেওয়া কন্যা জহরত আরা যে কি না শেষমেষ নিজেকে খুঁজে নেয় বাবা-মায়েরই পছন্দের লোক গানগুলোতে; লালনে, শাহ আবদুল করীমে, হাছন রাজায়, রাধারমনে—সেটিতে অভিষেক অভিনয়ের মধ্য দিয়ে দর্শকদের হূদয় ছুঁয়েছেন সারা আহমেদ। বিলেতে বাঙালি কমিউনিটির অন্যতম শিল্পী অমিত দে, লোকগানের মূর্ছনায় মায়াবী আবহ তৈরি করেছেন সবার জন্য। আর লেখক বুলবুল হাসান নিজেই স্থানীয় টিভির কর্ণধার হয়ে হাস্যরস, গান আর নাচে আয়না তুলে ধরেছেন চোরাবালিতে আটকে থাকা কমিউনিটি মিডিয়ার সংকটাপন্ন অবস্থার দিকে। 

নাটকটির নির্দেশক সৈয়দা সায়মা আহমেদ সচেষ্ট ছিলেন নির্দেশকের স্বাধীনতার পুরোটা ব্যবহার করতে—যাতে দর্শকরা হাসি আর আবেগ নিয়ে নিজেদের প্রবাসজীবনকে মেলাতে পারেন। নাট্যকার বুলবুল হাসান তাঁর এই মৌলিক নাটকে তুলে এনেছেন বাংলা লোকগানের অন্তর্নিহিত শক্তি কীভাবে বিলেতে বেড়ে ওঠা প্রজন্মের হাত ধরে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহমান রাখতে পারে। ‘নিরীক্ষাধর্মী’ হলেও সংগীত কীভাবে ভাষা, ভূগোল ও সংস্কৃতিগত সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সার্বজনীন হয়ে ওঠে—তারই এক অনবদ্য মঞ্চায়ন ‘দ্য লাভ সংস’।

ইত্তেফাক/এসটিএম